নির্ধারিত চারটি স্থানে বিএনপির খুলনা বিভাগীয় মহাসমাবেশের অনুমতি না পেয়ে নগরীর কে ডি ঘোষ রোডে দলীয় কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি পালন করেন নেতাকর্মীরা। কেন্দ্র ঘোষিত এই কর্মসূচি পালনে পুলিশের কাছে পাঁচ দিন আগে অনুমতি চাওয়া হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। 

ফলে  শনিবার সকাল থেকেই দলীয় কার্যালয় ঘিরে রাখে পুলিশ। জলকামান, সাঁজোয়া যান নিয়ে কার্যালয়ে যাওয়ার সব সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। নগরীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মাহিন্দ্র ও বাস চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ। সবকিছু মিলিয়ে নগরী হয়ে পড়ে অবরুদ্ধ। তবে এতসব বাধা পেরিয়ে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। সড়কের পাশাপাশি নৌযানও বন্ধ রাখা হয়। এতে ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয় মানুষকে।

মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেন, শনিবার বিকেল ৩টায় নগরীর মহারাজ চত্বরে তাদের সমাবেশ ছিল। এই সমাবেশে দলীয় নেতাকর্মীদের আসা-যাওয়া বাধাগ্রস্ত করতে পুলিশের নির্দেশে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বাস চলাচল বন্ধ করে দেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। গত তিন-চার দিনে বিএনপির ৩২ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশ বাড়াবাড়ি না করলে সাধারণ জনগণের কোনো দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।

জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সোনা বলেন, শনিবার খুলনায় বিশৃঙ্খলা হতে পারে- এমন আশঙ্কায় খুলনা থেকে দেশের সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

সকালে সরেজমিন সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন রুটের অসংখ্য যাত্রী ব্যাগ নিয়ে ঘোরাফেরা করছেন। বেশি দূরত্বের যাত্রীরা যানবাহন না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। আর স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাহিন্দ্রতে গন্তব্যে যান।

নগরীর রূপসা ঘাট, জেলখানা ঘাট ও কালীবাড়ি ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকায় রূপসা ও ভৈরব নদীর দুই তীরে অসংখ্য মানুষ অপেক্ষা করছেন। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। এ ছাড়া খুলনা থেকে কয়রাসহ সব রুটে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ ছিল।

বিএনপির সমাবেশকে ঘিরে নগরীর শিববাড়ি মোড় থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোড় পর্যন্ত যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে ট্রাফিক পুলিশ। এ ছাড়া আরও কয়েকটি সড়কে ছিল একই অবস্থা। এতে দুর্ভোগে পড়েন অনেকে। এ ছাড়া কে ডি ঘোষ রোডসহ বিএনপি কার্যালয়ের আশপাশের কয়েকটি সড়কে দোকানপাট খোলেননি মালিকরা।

যান চলাচল বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়া কুষ্টিয়া থেকে আসা রেজাউল করিম বলেন, শুনলাম বিএনপির সমাবেশে গোলমাল হতে পারে, তাই গাড়ি বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে যাত্রীরা খুব দুর্ভোগে পড়েছেন।

এ ব্যাপারে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদুর রহমানকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্য এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তারা বাস কিংবা নৌযান বন্ধ করেননি।

সরকারের তীব্র সমালোচনায় নেতারা : এই মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহান ওমর। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ কোনোদিন জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেছিল প্রশাসনিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ২০০৮ সালে মঈন-ফখরুদ্দীন কারচুপি করে ক্ষমতায় এনেছিল। আর ২০১৪ সালে তো ভোটই লাগেনি। ২০১৮ সালে আমার মতো লোককে সাত দিন ঘর থেকে বের হতে দেয়নি।

সমাবেশে তাবিথ আউয়াল বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়ে মানুষ বাকস্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। মার্কা থাকলে তার সাত খুন মাফ হয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, আজ জনগণ ভোট দিতে পারে না। নির্বাচনের কথা শুনলে প্রধানমন্ত্রী আঁতকে ওঠেন। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, এখন কথা বলা যাবে না, লেখা যাবে না- এ কেমন স্বাধীনতা পেলাম।

সমাবেশে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বসিকরপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মরহমান সরোয়ার বলেন, আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। 

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ভিন্নমতের লাখ লাখ যুবক পথে পথে ঘুরছে, তাদের চাকরি হয় না। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ইভিএম নামে একটি মেশিন বের হয়েছে, সেখানে ধানের শীষে ভোট দিলে নৌকায় চলে যায়।

রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, পুলিশ বাহিনীসহ দেশের প্রশাসনকে আজ জনগণের বিপক্ষে দাঁড় করানো হচ্ছে। আজকের সমাবেশ দেখে মনে হচ্ছে আমরা জেলখানার ভেতরে।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মশিউর রহমান ও হাবিবুর রহমান হাবিব, কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুজ্জামান খান শিমুল, সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী রুমি, বিএনপির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক সোহরাব উদ্দীন, সহ-প্রচার সম্পাদক কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান।

মন্তব্য করুন