প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে চট্টগ্রাম বন্দরের ৫২ একর জায়গা ঘিরে চলছে জমজমাট বাণিজ্য। এ বাণিজ্য কোটিপতি করেছে একটি পক্ষকে; কিন্তু নিঃস্ব করতে চলেছে দুই হাজার ৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষকে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি খাসজমি উদ্ধারে আজ সোমবার সকাল ৮টা থেকে উচ্ছেদ অভিযান চলবে। অন্যদিকে উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের আকুল আবেদন জানিয়েছে চরে বসতি স্থাপনকারী পরিবারগুলো।

জাল দলিল বানিয়ে এই পরিবারগুলোর কাছে কর্ণফুলীর তীরে গড়ে ওঠা লালদিয়ার চরের ৫২ একর সরকারি খাসজমি বিক্রি করা হয়েছিল। জমি কিনে সরল মানুষগুলো সেখানে নতুন ঘরবাড়ি তুলেছেন। কেউ স্ট্যাম্পে জায়গা বিক্রি করে তুলেছেন নতুন দোকান। কেউ আবার ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন। তৃতীয় একটি পক্ষ এভাবে সরকারি খাস জায়গা বেচাকেনা করে কোটিপতি হয়েছে। ভোটের মাঠে নেমে রাজনীতিকরা লালদিয়ার মানুষকে আশ্বাস দিয়েছেন, স্থায়ীভাবেই এ জায়গার মালিকানা পাবেন তারা; কিন্তু তা আশ্বাসই রয়ে গেছে।

অন্যদিকে, যারা সরকারি জায়গা অসহায় এ মানুষগুলোর কাছে 'ভিটেমাটি' হিসেবে বিক্রি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়েছে। বন্দরের যে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে ৫০ বছর ধরে অব্যাহতভাবে এ অন্যায় ও লুটপাট চলেছে, তারাও সদর্পেই চলাফেরা করছে। অবশ্য চট্টগ্রাম সফরে এসে লালদিয়ার চরের উচ্ছেদ কার্যক্রম প্রসঙ্গে নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, 'ভুয়া কাগজপত্রে লালদিয়ার চরের মাটি বিক্রি করে অনেকেই সম্পদ গড়েছেন। সরকারি জায়গায় ঘর তুলে ভাড়া দিয়ে কেউ কেউ দালানে থাকছেন। স্বার্থান্বেষী এসব ব্যক্তির তালিকা করা হয়েছে। লালদিয়ার জায়গা বন্দরের কাজে লাগবে। এখানে অবৈধ স্থাপনা রাখার কোনো সুযোগ নেই। যারা প্রকৃতই ভূমিহীন, তাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ব্যবস্থা নেবেন। আর যারা উচ্ছেদের বিপক্ষে ইন্ধন দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।' এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, 'কর্ণফুলী তীর দখলমুক্ত করতে আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এটি যথাযথভাবে মানতে হবে। আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করব।'

অন্যদিকে লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, 'নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ভাড়াটিয়া থাকার অভিযোগ তুলেছেন। যৌথ জরিপ করলেই এর উত্তর মিলবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে আদালতের প্রতিনিধি রেখে জরিপ করা হোক।' উচ্ছেদের আগে লালদিয়ার চরের ১৪ হাজার মানুষকে পুনর্বাসন করতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আকুল আবেদন জানান তিনি।

উচ্ছেদ শুরুর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি: স্মরণকালের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে আজ সোমবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে চলেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ছয়জন ম্যাজিস্ট্রেট একযোগে এ অভিযান শুরু করবেন। সাত শতাধিক পুলিশ, দুই শতাধিক র‌্যাব ও আনসার এ অভিযানে অংশ নেবে। আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদেরও গোয়েন্দা নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানের বিভিন্ন দিক নিয়ে গতকাল রোববার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে বন্দরের ডেপুটি স্টেট ম্যানেজার জিলল্গুর রহমান জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গত শনিবারের বৈঠকেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। উচ্ছেদ শেষ করে এ ব্যাপারে আদালতে প্রতিবেদনও দিতে হবে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে প্রস্তুতি বৈঠকও করেছে কর্তৃপক্ষ।

এক প্রশ্নের জবাবে জিল্লুর রহমান বলেন, 'গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের বেশিরভাগই লালদিয়ায় থাকেন না। তারা বহিরাগত। গোয়েন্দা সংস্থা এদের তালিকাও তৈরি করেছে।'

অন্যদিকে লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর বলেছেন, 'উচ্ছেদের আগে লালদিয়ার চরের ১৪ হাজার মানুষকে পুনর্বাসনের আকুল আবেদন জানাচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। সেখানে যারা আছেন, তারা ওই এলাকার আদি বাসিন্দা। তাই পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে দায় এড়াতে পারবে না বন্দর কর্তৃপক্ষ।'

লাভের মধু তৃতীয় পক্ষের পেটে: নগরীর পতেঙ্গায় বিমানবন্দর ঘাঁটি সম্প্রসারণের জন্য ১৯৭২ সালে কয়েক হাজার স্থানীয় বাসিন্দাকে সরিয়ে লালদিয়ার চরে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। ১৯৭৫ সালের পর চরের এই ভূমি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুকূলে বিএস জরিপে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু এ ভূমি উদ্ধারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেনি বন্দর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় একটি অংশের সঙ্গে যোগসাজশ করে চোখ বন্ধ রাখেন কর্মকর্তারা। এ সুযোগে লালদিয়ার চরে বেচাকেনা হতে থাকে ভিটেমাটি। আলমগীর হাসান, আবদুল কাদের, সাবেক কমিশনার আসলাম, বর্তমান কমিশনার ছালেহ আহমদ, হাজি ইকবালসহ ১৫-২০ জনের একটি দল এ চক্রের হয়ে কাজ করেছে বলে দাবি করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনেও খাসজমি নানাভাবে বেহাত হওয়ার উল্লেখ রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে বন্দরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, আন্দোলনকারীদের নেতা আলমগীরের বহুতল ভবন রয়েছে। আবদুল কাদেরের নামে আছে মার্কেট। কিন্তু এরা ভূমিহীন সেজে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

আন্দোলনকারীরা যা বলছেন: লালদিয়ার চর পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর জানান, ২০০৫ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ লালদিয়ার চরে বসবাসরত প্রায় ৫০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করে সে জায়গা ইজারা দেয় ইনকনট্রেড লিমিটেডকে। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো নির্মাণ করেছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও ২৫ একর জায়গা উন্নয়ন করে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এই উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সময়মতো সব অপপ্রচারের উত্তর দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করলে রাস্তায় শুয়ে থাকার ঘোষণা দিয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছালেহ আহমেদ বলেন, 'আমি তৃণমূলের আওয়ামী লীগ কর্মী। চারবারের কাউন্সিলর। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন, আপনি লালদিয়ার চরবাসীর আর্তনাদ শুনুন। লালদিয়ার চরকে আপনি যে কোনো মূল্যে বাঁচান।'

অসহায় মানুষকে নিয়ে রাজনীতি: লালদিয়ার চরের দুই হাজার ৩০০ পরিবারের ১৪ হাজার মানুষের ভোট স্থানীয় রাজনীতিতে একটি বড় 'ফ্যাক্টর'। তাই ভোট এলেই তাদের স্থায়ী করার প্রতিশ্রুতি দেন রাজনীতিকরা; কিন্তু ভোটের পর আর খবর নেন না। তাই প্রায় ৫০ বছর ধরে বন্দরের ভূমিতে 'অবৈধ দখলদার' হিসেবেই রয়ে গেছেন তারা। এখান থেকে একাধিকবার এমপি ও মন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো জনপ্রতিনিধিই চরবাসীর সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেননি।

তবে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু হতেই আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন রাজনীতিকরা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সদ্য বিদায়ী প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন পুনর্বাসন ছাড়া এই উচ্ছেদের বিরোধিতা করছেন। গত বৃহস্পতিবার নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনও একই দাবি জানিয়েছেন। যদিও শুরু হতে চলেছে আজ উচ্ছেদ অভিযান।