হাসপাতাল, রেলওয়ে কিংবা বাস স্টেশন। সবখানে রয়েছে ওদের তৎপরতা। প্রথম টার্গেট নারীদের গলার স্বর্ণের চেইন। কয়েকজন সদস্য দলবদ্ধ হয়ে ইচ্ছে করে ভিড় সৃষ্টি করে। ধাক্কাধাক্কি করে বাগবিতণ্ডায় জড়ায়। এরপর বিশেষ কাটার দিয়ে কেটে নেয় চেইন। মুহূর্তেই হাত বদল করে তা সরিয়েও দেওয়া হয়। অভিনব পন্থায় নারী ছিনতাইকারী চক্রের এমন তৎপরতা ময়মনসিংহে চলছিল বেশ কিছুদিন ধরে। সোমবার চক্রটির ছয় নারী সদস্য ও এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ।

জামালপুরের ইসলামপুর কলেজের প্রভাষক হাসনাহেনা মিতু। সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে ময়মনসিংহ থেকে অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করছিলেন কর্মস্থলে যাবার জন্য। সঙ্গে ছিল তার পাঁচ বছরের মেয়ে তোবা। মেয়েকে নিয়ে ট্রেনে ওঠার মুহূর্তে তাকে ঘিরে কয়েকজন নারী ও পুরুষ কৃত্রিম ভিড় সৃষ্টি করে। সুযোগ নিয়ে যাত্রীবেশী এক নারী শিশুটিকে তুলে দেয় ট্রেনে। ঠিক ওই সময়ই গলা থেকে কেটে নেয় শিশুটির চেইন।

মেয়ের গলায় চেইন নেই দেখে ট্রেনের ভেতরে ধরে ফেলেন পাপিয়া (২৮) নামে এক নারীকে। কলেজ শিক্ষক মিতুর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে চেইন নেওয়ার কথা স্বীকার করে পাপিয়া। ট্রেন থেকে পাপিয়াকে নামিয়ে জিআরপি পুলিশের কাছে নিয়ে যান ওই কলেজ শিক্ষক। পরে পুলিশের সহায়তায় পাপিয়াকে দিয়ে কৌশলে ডাকা হয় তার চাচাতো বোন শিল্পি আক্তারকে। শিল্পির কাছ থেকে উদ্ধার হয় চেইন। পরে বিকেল চারটার দিকে তাদের ময়মনসিংহ গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শিল্পি ও পাপিয়ার বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলের চরশ্রীরামপুর এলাকায়।

তবে পুলিশ হেফাজতে থাকা পাপিয়া ও শিল্পির দাবি, তারা মামা আবেদীনের সঙ্গে জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় ভাগ্নের শ্বশুর বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছিলেন। তার মামা ছিনতাই কাজে জড়িত। মামাই স্বর্ণের চেইনটি নিয়ে পাপিয়কে দিয়ে চলে যেতে বলেন।

নগরীর শম্ভুগঞ্জ সেতু এলাকা, রেলওয়ে স্টেশন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বেশি জনসমাগম হয় এমন স্পটকে টার্গেট করে একটি চক্র অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ অভিযানে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল ছিনতাইকারী চক্রের আরও পাঁচ সদস্যকে সোমবার সকালে গ্রেপ্তার করেছে।

শম্ভুগঞ্জ এলাকার রঘুরামপুর টানপাড়া এলাকা থেকে আটক করা হয় চার নারী ও এক যুবককে। তারা হলেন, নাসিমা বেগম (২২), নিহার বেগম (২৫), শিল্পি বেগম (২৫), মনোয়ারা বেগম (৪৫), সুরাইয়া বেগম (৪১) ও মো. রাশেদ মিয়া (২৫)। তাদের সবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকায়। বাসা ভাড়া নিয়ে গত অন্তত তিন মাস ধরে নগরীতে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল চক্রটি। অভিযানের সময় উদ্ধার করা হয় দশটি স্বর্ণের চেইন, চারটি বিশেষ কাটার ও বিভিন্ন সরঞ্জাম।

চক্রটির সদস্যরা জানান, যাত্রীবেশে তারা সিএনজি চালিত কিংবা ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা বা ট্রেনে ওঠে। এমনকি হাসপাতালেও চলে তাদের অপতৎপরতা। গলায় স্বর্ণের চেইন রয়েছে এমন নারীকে টার্গেট করেন প্রথমে। এরপর ঘিরে ধরে জটলা পাকান। ইচ্ছে করে টার্গেট নারীর সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে আরেক সদস্যকে দিয়ে বিশেষ কাটারের মধ্যমে গলার চেইন কেটে নিয়ে যান তারা।  এরপর দ্রুত সেটি হাত বদল করে স্থানও ত্যাগ করে ফেলেন।

এই ছিনতাই চক্রের সাত সদস্যদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে সোমবার রাতে থানায় মামলা করা হয়েছে। মঙ্গলবার রিমান্ড চেয়ে তাদের আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহ কামাল আকন্দ।

ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার মোহা. আহমার উজ্জামান বলেন, জনসমাগম হয় এমন স্থান টার্গেট করে অপতৎপরতা চালাচ্ছিল চক্রটি। চক্রটির কয়েক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চক্রের অন্য সদস্যদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

মন্তব্য করুন