আব্দুস ছোবহান, বাবুল মিয়া, জাহানারা বেগম ও হোসনে আরা- সবাই চাতাল শ্রমিক। নিজেদের মধ্যে রয়েছে আত্মীয়তা ও পারিবারিক সর্ম্পকও। এক সঙ্গে চাতালে ধান সিদ্ধ-শুকানো, চাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করেন সমান তালে। তাদের সবারই মজুরি কম। তবে বেশি কম জাহানারা ও হোসনে আরার। তারা আব্দুস ছোবহান ও বাবুল মিয়ার অর্ধেক মজুরিতে কাজ করেন।

শুধু তারা কয়েকজনই নয়- পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় অর্ধেক মজুরি নিয়েই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের চাতালগুলিতে কাজ করছেন অন্তত ১৫ হাজার নারী শ্রমিক। নিজেদের মজুরি কমের বিষয়টি নারী শ্রমিকেরা বুঝলেও তা নিয়ে কখনো কথা বলেননি, করেননি কোন অভিযোগও। ফলে নারী শ্রমিকদের বঞ্চনার বিষয়টি অজানা স্থানীয় শ্রম দপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, নারী শ্রমিকেরা বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করলে আলোচনা করে সমাধান করার উদ্যোগ নেওয়া যেত। পুরুষ শ্রমিকদের দাবি, নারী শ্রমিকেরা তাদের নিজস্ব লোক এবং নারীরা বোঝা বহনসহ কিছু কাজ করেন না। আর চাল উৎপাদনের নির্ধারিত মজুরি শ্রমিক সর্দারদের হাতে দেওয়া হয় এবং বন্টনের বিষয়টি তাদের একান্ত নিজস্ব বলে জানান চাতাল মালিকগণ।

জানা গেছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চাল উৎপাদনের কেন্দ্র আশুগঞ্জে ৪ শতাধিক চাতালে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিকের অর্ধেকই নারী। এরা হত দরিদ্র ও প্রায় সবাই নিরক্ষর। চাতালের সার্বক্ষণিক শ্রমিক হলেও সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থে বেশির ভাগ নারী শ্রমিক স্বামী, ছেলে বা পরিবারের অন্য পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে একত্রে কাজ করেন। তবে এককভাবে কাজ করেন এমন নারী শ্রমিকের সংখ্যাও অনেক।

সাধারণত চাতালে শ্রমিকেরা অগ্রিম 'দাদন' (শ্রম বিক্রি বাবদ অগ্রিম টাকা) নিয়ে মিল মালিকদের সাথে 'কাজ নেই মজুরি নেই' এ চুক্তিতে কাজ করেন। ধানের মাঠ হিসবে শ্রমিকদের হাজিরা অনুপাতে মাঠ-সর্দাররা কাজের মজুরি বন্টন করেন।

জানা গেছে, পুরুষ শ্রমিকদের দৈনিক হাজিরা ১৫০ থেকে ২'শ টাকা হলেও নারী শ্রমিকের মজুরি হাজিরা পড়ে ৭০ টাকা। পুরুষ শ্রমিকদের কথা, নারী শ্রমিকেরা ট্রাকে ধান-চাল উঠানামা বা বোঝা বহনের কাজ করতে পারেন না। তাছাড়া নারী শ্রমিকেরা তাদের পরিবারেরই সদস্য।

তবে নারী শ্রমিকদের দাবি, তারা বোঝা বহনের কাজ না করলেও তাদের মাঠের কাজ যেমন- ধান শুকানো, চাল তৈরি বা প্রক্রিয়াকরণে বেশি সময় দেন। যেসব নারী শ্রমিক পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে কাজ করেন তারা বিষয়টিকে মনে করেন স্বাভাবিক। আরা যারা এককভাবে কাজ তারাও সচেতনতা নিরাপত্তা স্বার্থেই কখনো অভিযোগ করেন। ফলে এ ব্যাপারে কিছু জানে না স্থানীয় সরকারি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্র বা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়। তবে তারা জনিয়েছে, কোনও নারী শ্রমিকের অধিকার ক্ষুন্ন হলে, কেউ অভিযোগ করলে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে হিমেল রাইস মিলের নারী শ্রমিক রহিমা, ছোফেরা, আবেদিন রাইস মিলের রত্না, কুহিনুর, হক রাইস মিলের বাসনা ও অঞ্জনা জানান, বোঝা বহনের কাজটি পুরুষেরা করে বলে আমরা কাজ কম করি তা ঠিক নয়। আমরা তো মাঠের কাজ বেশি করি। পুরুষেরা কাজ ফেলে বাইরে গেলেও আমরা যাইনা। তারা বেশি বেতন নেয়, আমরা এতে আপত্তি করিনা। তবে অর্ধেকের কম মজুরি ঠিক না।

মজুরি বৈষমের বিষয়টি স্বীকার করে চাতাল শ্রমিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্বাস সরদার সমকালকে বলেন, চাতাল শ্রমিকদের মজুরি সবারই কম। নারী শ্রমিক তো আমাদের পরিবারেরই লোক। তারা কিছু কাজ না করায় হাজিরা কম দেওয়া হয়। তবে তাদের হাজিরা বাড়া দরকার।

আশুগঞ্জ উপজেলা চাতাল কল মালিক সমিতির সভাপতি মো. জুবায়ের হায়দার ভুলু বলেন, প্রত্যেক মালিক চুক্তি মোতাবেক শ্রমিকদের নির্ধারিত মজুরি সর্দারদের (প্রতি চাতালের একজন) হাতে দেন। এ মজুরি তারা নিজেদের মাঝে কিভাবে বণ্টন করে বা হয় সেটা শ্রমিকদের একান্ত নিজস্ব বিষয়।

এ ব্যাপারে আশুগঞ্জ সরকাররি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রের জনসংখ্যা ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা মো. নাঈম আহমেদ এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার সমকালকে বলেন, মজুরি বৈষ্যমের বিষয়টি এ পর্যন্ত কেউ আমাদেও জানাননি। কোনও নারী শ্রমিক অভিযোগও করেনি। তবে কোন নারী ন্যায্য দাবি করে অভিযোগ দিলে আমরা শ্রম আইন অনুসারে তাদের সহায়তা দিব।