ব্যস্ত রাস্তায় তরুণীরা সাইকেল চালাবেন-এমনটি নিকট অতীতেও ভাবনার বাইরে ছিল। কিন্তু ক্রমশ সেদিন বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাইকেলে তরুণীদের উৎসাহ বেড়েছে, শিশুরাও ঝুঁকছে সাইকেলে। নারীদের সাইকেলে আগ্রহী করতে প্রতি সপ্তাহে দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ। ‘ময়মনসিংহ সাইক্লিস্টস’ নামের এক সংগঠন নিয়েছে এমন উদ্যোগ।

ময়মনসিংহ নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে প্রতি বুধবার বসে শিশু ও তরুণীদের সাইকেল শেখানোর যজ্ঞ। পরম যত্নে একদল তরুণী ও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক মিলে ক্ষুদে শিক্ষার্থী ও তরুণীদের সাইকেল চালানো শেখান। সাইকেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্যাডেলে পা দিয়ে চালাতে গিয়ে অনেকে পড়েও যান। প্রশিক্ষকরা যত্ন করে সাইকেল চালানো শিখিয়ে দেন। কেউ প্রথমদিন এসেই আবার কেউ দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে শিখতে পারেন সাইকেল চালানো। নিজে সাইকেল চালানো শিখতে পেরে বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে সবুজ মাঠ দাপিয়ে বেড়ান। এ যেন অজেয়কে জয় করা। 

তরুণীরা সাইকেল চালানো শেখায় অভিভাবকরাও আনন্দিত হন। প্রতি শুক্রবার হয় ‘বাইক ফ্রাইডে’। এদিন সার্কিট হাউজ মাঠ থেকে সকাল ৭টায় বেরিয়ে ১০টার মধ্যে পুনরায় ফিরে আসেন তারা। যারা সাইকেল শিখেছেন সেসব তরুণী ও স্বেচ্ছাসেবক তরুণদের সমন্বয়ে আরও তরুণীদের উৎসাহী করতে চলে রাইড। নগর ছাড়িয়ে গ্রামের মুক্ত সবুজের মেঠো পথ ধরে ছুটে চলে তাদের সাইকেল। কেউ কেউ যানজটের ভোগান্তি থেকে রেহাই পেতে সাইকেল ছুটিয়ে চলে প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে।  

ময়মনসিংহ নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে সাইকেল চালানো শিখছেন তরুণীরা

ব্যস্ত নগরীতে তীব্র যানজট থেকে মুক্তি পেতে সাইকেলে মানুষকে উৎসাহী করে তুলতে ২০১৮ সালে সূচনা হয় ‘ময়মনসিংহ সাইক্লিস্টস’ গ্রুপের। মাখলুকুর রহমান তন্ময় মুখ্য ভূমিকায় থেকে শুরু করেন যাত্রা। নিয়মিত সাইক্লিং করার পাশাপাশি সাইকেলের উপকারী দিক তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপ খুলে চলে উৎসাহী করার কাজ।

২০১৯ সালে বিনামূল্যে সাইক্লিং শেখানোর কাজ শুরু করেন স্বেচ্ছাসেবকরা, যা নগরীতে ব্যাপক সাড়া ফেলে। নারী ও শিশুরা সাইকেল চালানো শিখতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে উৎসাহী হয়ে তরুণী ও শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে সংগঠনটির সঙ্গে যোগাযোগ করে শুরু হয় সাইকেল শেখা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মাঝে কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বছরের শেষের দিকে আবারও শুরু হয় বাইক ফ্রাইডে রাইড। 

গেল শীত মৌসুমে সার্কিট হাউজ মাঠে নিয়মিত দেখা মেলে তরুণী ও শিশু সাইকেল শেখায় আগ্রহীদের। স্বেচ্ছাসেবীদের সাইক্লিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শহরে অন্তত ৫ শতাধিক নারী ও শিশু ইতোমধ্যে সাইকেল চালানো শিখেছে। সাইকেল শেখার পর তরুণীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট অন্যদের আগ্রহী করে তুলছে। এতে ক্রমশ সাইক্লিংয়ে সবার আগ্রহ বাড়ছে। 

জেমিন তাসমিন শেফার বাড়ি নেত্রকোনায়। পড়েন সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে। কয়েক মাস আগেও সাইকেল চালানো ছিল তার কাছে স্বপ্নের মতো।  কিন্তু এখন তিনি অন্যদের সাইকেল চালানো শেখান। 

শেফা বলেন, শেখার সময় অনেকবার পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে হয়েছে। কিন্তু যতবার পড়েছি ততবার উঠে দাঁড়িয়েছি। 

তিনি জানান, তরুণীদের সংকোচ কাটিয়ে উৎসাহ দিয়ে সাইকেল চালানো শেখাচ্ছেন তারা। 

ময়মনসিংহ নগরীর সার্কিট হাউজ মাঠে সাইকেল চালানো শিখছেন তরুণীরা

ট্রেইনার তারিন তাসনিম ইরা জানান, সাইক্লিং শিখতে পারা মানুষদের মুখে হাসি ফোটানোই আনন্দের। নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যে ময়মনসিংহ একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এমনটি প্রত্যাশা। 

সার্কিট হাউজ মাঠে মেয়েরা সাইকেল চালানো শিখছে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছেন অনেক মা-বাবা। সন্তানদের সাইকেল শেখায় উচ্ছ্বসিত তারাও। 

ময়মনসিংহ সাইক্লিস্ট গ্রুপের প্রধান সমন্বয়ক মাখলুকুর রহমান তন্ময় বলেন, তরুণী ও শিশুদের সাইকেল শেখাতে সতর্কতার সঙ্গে সব প্রশিক্ষক কাজ করেন। আগ্রহীদের অন্তত ১৫ জনকে প্রতি সপ্তাহে ডেকে শেখানোর কাজ করছেন তারা। অভিভাবকদের সামনেই নারী প্রশিক্ষকরা নিবিড়ভাবে সাইকেল চালানো শেখান। সাপ্তাহিক রাইড কিংবা সচেতনতামূলক শোভাযাত্রায় পুরুষ রাইডারদের পাশাপাশি নারীরাও স্বমহিমায় অংশ নিচ্ছেন।