খুলনা মহানগরীর শিপইয়ার্ড প্রধান সড়ক থেকে সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন মুক্তার বাড়ির পাশের কালভার্ট পর্যন্ত এলাকার নাম 'জিন্নাহপাড়া'। অনেক বছর আগে পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর নামে নামকরণ হয়েছিল এলাকাটির। কিন্তু এরপর আর কখনও পরিবর্তন হয়নি। ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের এই এলাকার একটি সড়কের নামও 'জিন্নাহ মেইন রোড'।

জেলার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামের সরিষাপাড়া এলাকায় রয়েছে 'খান এ সবুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়'। আইয়ুব খান সরকারের সময়কার মন্ত্রী ও মুসলিম লীগ নেতা স্বাধীনতাবিরোধী খান এ সবুরের নামে বিদ্যালয়টির নাম। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও খুলনায় রয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী দু'জনের ছায়া। এ দুটি এলাকা ও প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনের জন্য এখনও তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ খুলনার মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার সপক্ষের মানুষ।

নগরীর কাস্টম ঘাট এলাকা থেকে খুলনা সার্কিট হাউস মাঠ হয়ে যশোর অভিমুখী সড়কটির নাম এক সময় ছিল 'লোয়ার যশোর রোড'। পরে সড়কটির নাম পরিবর্তন করে 'খান এ সবুর রোড' করা হয়। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে হাইকোর্ট সড়কটির নাম পরিবর্তন করে যশোর রোড করার জন্য খুলনা সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেয়। এরপর সড়কটির দুই পাশের বাড়ি ও প্রতিষ্ঠানের মালিকরা সাইনবোর্ড ও নামফলকে সড়কের নাম পরিবর্তন করে যশোর রোড লেখেন। কিন্তু  সরকারি-বেসরকারি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এখনও তাদের ঠিকানায় খান এ সবুর রোড লেখা রয়েছে।

নগরীর ২০ নং সাউথ সেন্ট্রাল রোডে 'খান এ সবুর মহিলা মাদ্রাসা'র নাম পরিবর্তন করে 'খুলনা মহিলা আলিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মডেল মাদ্রাসা' করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই নামের সাইনবোর্ডের পাশে আগের নামের ব্যানারও রয়েছে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম সমকালকে বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরও স্বাধীনতাবিরোধী কারও নামে কোনো প্রতিষ্ঠান, সড়ক, স্থাপনা, এলাকা বা অবকাঠামো থাকার কথা নয়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এখনও তা রয়েছে। তিনি বলেন, এগুলো বাতিলের দাবিতে শিগগিরই তারা সোচ্চার হবেন।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদের খুলনা মহানগর কমান্ডার অধ্যাপক আলমগীর কবীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীন দেশে পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর নামে একটি এলাকার নাম থাকতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধারা এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে এলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। সড়ক, মাদ্রাসা ও এলাকার নাম পরিবর্তনে খুলনা সিটি করপোরেশনের আরও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোক্তার হোসেনের ছেলে মফিদুল ইসলাম টুটুল বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে বিতর্কিতদের নামে খুলনায় এখনও রাস্তা, প্রতিষ্ঠান ও এলাকার নাম থাকার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক এবং কলঙ্কজনক। এই নাম দ্রুত পরিবর্তন করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে নামকরণ করার জন্য তিনি দাবি জানান। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. আরিফ হোসেন মিঠু বলেন, জিন্নাহপাড়া এলাকার নাম পরিবর্তন করার জন্য সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভায় প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

দিঘলিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহানাজ বেগম জানান, তিনি এই উপজেলায় যোগদানের আগে তৎকালীন শিক্ষা কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠান। ওই চিঠিতে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করার প্রস্তাব করা হয়। এরপর আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিষয়টি তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।