কুড়িগ্রামের রৌমারীতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা দরে কেজির ১২০ টন চাল চার দিন ধরে নৌকাঘাটে আটকে রয়েছে। সম্প্রতি ট্রাক্টর দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এলাকাবাসী। ফলে সাময়িকভাবে ট্যাফে ট্রাক্টর (কাঁকড়া) চলাচল নিষিদ্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। 

আদেশ অমান্যের অপরাধে ট্যাফে ট্রাক্টরের দুই চালককে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫ দিনের জেল দেওয়া হয়। এ কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ট্যাফে ট্রাক্টর মালিক-শ্রমিকরা। এই ত্রিমুখী দ্বন্দ্বে স্থবির হয়ে পড়েছে উন্নয়ন কার্যক্রম ও জনজীবন।

রৌমারী নৌকাঘাটে আটকে আছে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১২০ টন চাল। এ ছাড়া রয়েছে চিলমারী ডিপো থেকে নিয়ে আসা শতাধিক ডিজেল ভর্তি ড্রাম ও রৌমারী বাজারের গালামাল দোকানিদের নিত্যপণ্য সামগ্রী। অন্যদিকে মাটি, ইট, সিমেন্ট, পাথর ও বালু আনতে না পারায় ব্যাহত হচ্ছে দাঁতভাঙ্গা-জামালপুর সীমানা পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক ও ব্রহ্মপুত্র নদের তিন কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প।

১০ টাকা দরে কেজির কার্ডধারী হতদরিদ্র সাইফুল ইসলাম বলেন, বাজারের ভালো চালের দাম ৬০-৭০ টাকা। আমাদের গরিবের মোটা চাল ৪৫ টাকা কেজি, যা আমার কেনার সামর্থ্য নেই। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১০ টাকা দরে চাল সেটাও পাই না, এখন কী খেয়ে বাঁচি।

খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার স্বাধীন মিয়া জানান, আমরা ডিলাররা ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ডিও লেটার নিয়ে বসে আছি। কিন্তু গুদামে চাল না থাকায় কার্ডধারীদের চাল দিতে পারছি না।

এদিকে রৌমারী-ঢাকা সড়ক ও জনপথের ঠিকাদার মেসার্স মীর হাবিবুল আলম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক বখতিয়ার হোসেন বলেন, মাটি, ইট, পাথর ও বালু আনা-নেওয়ার গাড়ি বন্ধ থাকায় সড়ক উন্নয়নের কাজ বন্ধ রয়েছে। সামনে বৃষ্টি-বাদলের দিন আসছে। সঠিক সময়ে মাটি-বালুর কাজগুলো করতে না পারলে এ বছরে আর করা যাবে না। ফলে জনভোগান্তি আরও বেড়ে যাবে।

রৌমারী বাজারের ব্যবসায়ী মোয়াজ্জেম হোসেন মাছুম জানান, রৌমারী উপজেলা উন্নয়ন কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে উঠেপড়ে লেগেছে একটি কুচক্রী মহল। তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা দরকার। তা না হলে উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে, জনভোগান্তি আরও বেড়ে যাবে।

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ইশকে আব্দুল্লাহ বলেন, উপজেলার বরাদ্দকৃত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ২২০ টন চাল কুড়িগ্রাম খাদ্যগুদাম থেকে আনতে হয়। পরিবহন জটিলতার কারণে রৌমারী নৌকাঘাটে ১২০ টন চাল আটকে আছে। বাকি চালগুলো কুড়িগ্রাম গুদামেই রয়েছে। ফলে রৌমারী উপজেলার ১৪ হাজার ৫৯৪ কার্ডধারীর চাল বিতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।

ট্যাফে ট্রাক্টর মালিক মো. কানু মিয়া বলেন, উপজেলার বেশিরভাগ রাস্তায় ট্যাফে ট্রাক্টর ছাড়া চলাচলের অনুপযোগী। ফলে বেশিরভাগ মালিক ব্যাংকের লোন নিয়ে কিস্তিতে এ ট্রাক্টর কিনেছি। গাড়ি না চললে আমরা কিস্তি পরিশোধ করব কী করে?

ট্যাফে ট্রাক্টরের মালিক মো. রকিব মণ্ডল, আবু তালেব, হারিজুল হক ও সুজন মিয়া বলেন, উপজেলায় দুই শতাধিক ট্যাফে ট্রাক্টর রয়েছে। প্রতিটি গাড়িতে পাঁচজন করে শ্রমিক কাজ করেন। গাড়ি বন্ধ থাকায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

রৌমারী উপজেলা ট্যাফে ট্রাক্টর মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম মিনু বলেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে মাইকিং করে ট্যাফে ট্রাক্টর চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আমাদের গাড়ি বন্ধ রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে প্রশাসন চাইলে আমরা গাড়ি দেব। বুধবার সন্ধ্যায় মালিক-শ্রমিক মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, চালকদের লার্নার ও লাইসেন্স নেওয়ার জন্য বলে দিয়েছি এবং নদী থেকে উত্তোলনকৃত বালু পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

রৌমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান বলেন, এখানে কয়েকটি গ্রুপ হয়েছে, বিষয়টি নিরসন করা খুবই জটিল। আমি চেষ্টা করছি দ্রুত সমাধানে নিয়ে আসার জন্য।