সোমবার বিকেলে উখিয়ার বালুখালীর রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে অগ্নিকাণ্ডের ফলে হতাহতের ঘটনায় যে মর্মান্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা যেমন বেদনাদায়ক তেমনই উদ্বেগজনক। পুলিশের ভাষ্যমতে শিশুসহ ১১ জনের প্রাণহানির কথা বলা হলেও জাতিসংঘের তথ্যমতে নিহতের সংখ্যা ১৫। বর্তমান বিশ্বের 'সর্ববৃহৎ' এই শরণার্থী শিবিরের নয় হাজারের বেশি ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রবাহেও ভাটা দেখা দিয়েছে। এমনিতেই বাস্তুহারা এই জনগোষ্ঠীর দ্বিতীয় দফায় আশ্রয়হীন হওয়া মড়ার উপর খাঁড়ার ঘার শামিল। অস্বীকার করা যাবে না যে, চৈত্র মাসে অগ্নিকাণ্ড আমাদের দেশে প্রায় নিয়মিত ব্যাপার। সে কারণে একটি শরণার্থী শিবিরের গাদাগাদি পরিবেশে প্রয়োজন ছিল বাড়তি সতর্কতা। দুর্ভাগ্যবশত, এ ব্যাপারে স্পষ্ট ব্যত্যয় ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, গত এক সপ্তাহের মধ্যে বালুখালী রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে তিনবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আমরা মনে করি, বিলম্বে হলেও এদিকে নজর দিতে হবে। সর্বশেষ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় সাত ঘণ্টার চেষ্টায় দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও সবসময় তা সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। এরই মধ্যে জীবন ও সহায়সম্বলের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করাও সহজ নয়। এও মনে রাখতে হবে, এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই প্রশ্ন তুলতে বাধ্য। আমরা জানি, রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে নিরাপত্তার বিষয়টি বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ।

বিপথগামী কিছু সংখ্যক শরণার্থীর এর আগেও নানারকম অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এমনকি তাদের কেউ কেউ জঙ্গিবাদের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ার ও চোরাচালানের সংঘবদ্ধ অপতৎপরতার খবর নতুন নয়। দফায় দফায় নিপীড়িত, বাস্তুচ্যুত অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য মানবতার তাগিদেই সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু আশ্রিত ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী এখন বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শুধু বোঝা হয়েই দাঁড়ায়নি, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও ক্রমেই বাড়ছে উদ্বেগ। সোমবারের অগ্নিকাণ্ড তাই সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েই পর্যালোচনার তাগিদ দিল। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখা জরুরি, তাদের এভাবে গাদাগাদি করে বেশিদিন রাখা যাবে না। ঘনবসতিপূর্ণ এ ধরনের আশ্রয় শিবিরের অগ্নিনির্বাপণও যে কতটা দুরূহ বলাই বাহুল্য।

আমরা মনে করি, এ ঘটনার উৎস সন্ধানে দ্রুত কার্যকর তদন্তক্রমে আশ্রয় শিবিরের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজরদারি কঠোর করার বিকল্প নেই। রোহিঙ্গাদের যত দ্রুত সম্ভব নিজভূমে ফেরত পাঠানোরও বিকল্প নেই। বাংলাদেশ অনির্দিষ্টকাল ধরে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর বোঝা বহন করতে পারে না। যদিও মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা চালিয়েই যেতে হবে। স্থানীয় অধিবাসী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে শত্রুতা-বিদ্বেষ-সংঘাতের মতো উদ্বেগজনক পরিস্থিতিও বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে, যতবেশি সম্ভব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যকে ভাসানচরের সাময়িক আবাসনে স্থানান্তর করা। আমরা জানি, ইতোমধ্যে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন চলছে। অগ্নিকাণ্ডের শিকার রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নতুন ঘর তৈরি করে দেওয়ার বদলে সরাসরি ভাসানচরে স্থানান্তর করার কথা ভাবতে পারে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোর অগ্নিকাণ্ডবিরোধী প্রস্তুতি ও সক্ষমতা দুই-ই বাড়ানো প্রয়োজন।

এখন সর্বাগ্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আশ্রয়হীন এসব শরণার্থী স্থানীয়ভাবে যাতে ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকে সতর্ক নজর রাখা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরা আশা করি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সব সংস্থা ও দেশ মানবিক তাগিদে এগিয়ে আসবে এবং রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। কেবল অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নয়; বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাদের প্রয়োজনীয় রসদও নিশ্চিত করতে হবে। আর সব পক্ষকে সক্রিয় হতে হবে- তারা যাতে দ্রুত রাখাইনে নিজভূমে ফিরে যেতে পারে।

মন্তব্য করুন