সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। ১৭ মার্চ একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে ঘিরে হিন্দু অধ্যুষিত এ গ্রামে চলে তাণ্ডব। হেফাজতে ইসলামের নেতা মামুনুল হকের সমর্থকদের ওই হামলায় আক্রান্ত হয় গ্রামের তিনটি পাড়া। বর্বর হামলার শিকার এই গ্রামে এখন নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদচারণা। ১০ দিন পর গতকাল শনিবার দুপুরে হামলার শিকার গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, আক্রান্ত পরিবারগুলোর কান্না, ক্ষোভ আর আতঙ্ক। প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের শত আশ্বাসেও চাপা পড়ে যায়নি সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি। শত বছরের বিশ্বাস আর আস্থায় যেন চিড় ধরেছে।

দুমড়ানো-মোচড়ানো টিনের ঘরে বসে রঞ্জনা চৌধুরী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'হামলার পর থেকে ঘরে কিছুই নেই। রান্নার হাঁড়িপাতিলও লুট হয়ে গেছে। এখন সরকার ১০ কেজি করে চাল দিয়েছে। কোনো সহায়তা চাই না। শুধু নিরাপদে বাঁচতে চাই।' প্রশ্ন ছুড়ে রঞ্জন চৌধুরী বলেন, 'প্রশাসন, পুলিশ কয় দিন নিরাপত্তা দেবে? খবরওয়ালারা কয় দিন খবর করবে? চাল-ডাল দিয়ে কয় দিন বুঝ দিয়ে রাখবে? মনে যে ভয় আসছে, সেটা তো যাচ্ছে না। একটা ছোট বাচ্চা জোরে কাঁদলেও আতঙ্ক লাগে। রাতে ঘুমাতে পারি না। যে ক্ষত হয়েছে, সেই ক্ষত কীভাবে শুকাবে? মনের ক্ষত কতদিন বয়ে বেড়াতে হবে জানি না!'

নোয়াগাঁও গ্রামের গা-ঘেঁষেই দারাইন নদী। শুস্ক মৌসুমেও নদীতে পানি টইটম্বুর। যে নদী ১৭ মার্চের হামলার নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। ওই নদী দেখিয়ে মুক্তিযোদ্ধা অনিল দাস বলেন, 'দুর্বৃত্তরা এই নদী পার হয়েই গ্রামে এসেছে। নদীর কারণেই অনেক মানুষ প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। দূর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলাকারীদের গ্রামে প্রবেশের দৃশ্য দেখে অনেকেই পালিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। না হলে অনেক লাশ পড়ত।'

ভাঙা টিনের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চান মনি (৮০) বলেন, 'আমি হিন্দু। আমরা হিন্দু। এইটাই কি আমাদের অপরাধ।' মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাস বলেন, '১০ দিন হয়ে গেলে এখনও প্রকৃত আসামিরা ধরা পড়েনি। এজাহারভুক্ত পাঁচ-ছয়জন আসামি ধরা পড়েছে। সামনে ধান কাটার মৌসুম। পাকা ধান ঘরে তোলা নিয়ে আতঙ্কে আছি। এখানে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে।'

হামলাকারীদের রক্ষার চেষ্টা: হামলাকারীদের নানাভাবে রক্ষার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর গ্রামবাসীর পক্ষে হবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল একটি মামলা করেন। এর আগে গ্রামবাসী ৭২ জন আসামির তালিকা দিলেও মামলায় ৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। আসামি করা হয় অজ্ঞাত ১৪০০-১৫০০ জনকে। অবশ্য গত বৃহস্পতিবার শাল্লা থানায় ফেসবুক স্ট্যাটস দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার ঝুমন দাস আপনের মা নিভা রানী দাসের মামলার আবেদনে ওই ২২ জনসহ ৭২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এই মামলা রেকর্ড না করে আগের মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে আদালতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাল্লা থানা পুলিশ। গ্রামের অনেকেই দাবি করেছেন, ঘটনার দিন সশস্ত্র অবস্থায় ৭২ জনকে তারা চিনতে পেরেছেন। গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎ চন্দ্র দাশের ছেলে লিটন চন্দ্র দাশ বলেন, ঘটনার পর ৭২ জনের নামের তালিকা হয়েছে জানতাম আমরা। পরে মামলায় ৫০ জনের তালিকা কীভাবে হলো জানি না।

গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা বললেন, বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল কিংবা শাল্লা থানার এসআই আব্দুল করিমের করা মামলায় সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। নিভা রানী দাসের আবেদনটি মামলা হিসেবে রেকর্ড করলে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হতো।

দিরাই থানার ওসি নাজমুল হক বলেন, নিভা রানী দাসের আবেদন অন্য মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করে আদালতে পাঠানো হচ্ছে। আদালত যে আদেশ দেবেন, সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নোয়াগাঁও পরিদর্শন নাগরিক প্রতিনিধি দলের: গতকাল নোয়াগাঁও গ্রাম পরিদর্শন করেছে ঢাকার একটি নাগরিক প্রতিনিধি দল। এ সময় হামলার শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন তারা। প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, বাংলাদেশ জাসদের নারীবিষয়ক সম্পাদক তনিমা সিদ্দিকী, এলআরডির রফিক আহমেদ সিরাজী, আইইডির হরেন্দ্র নাথ সিং, আদিবাসী ফোরামের দীপায়ন খীসা ও সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের পারভেজ।