ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ

শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ

চেংনা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়

 কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০০:২৯

গাজীপুরের কাপাসিয়ার একটি বিদ্যালয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকসহ চার শিক্ষক ও চারজন কর্মচারী নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের জমিদাতা সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে অভিযোগ করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের চেংনাগ্রামে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চেংনা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়টি সম্প্রতি উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়। এমপিওভুক্তির সম্ভাবনা দেখা দিলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনির হোসেন চার শিক্ষক ও চার কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। চারজন শিক্ষকের মাঝে তিনজনকে সাবেক প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা পরিষদের সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে ও ভুয়া নিয়োগ কমিটি সাজিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিদ্যালয়ের জমিদাতা ও দাতা সদস্য আব্দুল খালেক আকন্দ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, উপপরিচালক, স্থানীয় সংসদ সদস্য, গাজীপুর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার মিলছে না।

অভিযোগ ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক মো. সাহাবউদ্দিন ও মাজহারুল ইসলামের যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর এবং সহকারী শিক্ষক আবু তাহেরের যোগদানের তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৫ সালের ৭ মার্চ। সাবেক প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বন্দুকসীর জাল স্বাক্ষরে দেওয়া তাঁদের নিয়োগপত্রে বিদ্যালয়ের নাম ‘চেংনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ লেখা রয়েছে। অথচ একই প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষরিত ২০০৮ সালে সহকারী শিক্ষক ফরিদা ইয়াসমিনের বৈধ নিয়োগপত্রে বিদ্যালয়ের নাম লেখা আছে ‘চেংনা নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়’। ২০০৯ সালের নভেম্বরে ওই প্রধান শিক্ষক অবসরে গেলে চেংনা গ্রামের আব্দুল মান্নান ডাক্তারের ছেলে ও পার্শ্ববর্তী নরোত্তমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীর চর্চা শিক্ষক মনির হোসেন বিধিবহির্ভূতভাবে ২০১০ সালের ১ এপ্রিল প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। এমনকি অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক মো. সাহাবউদ্দিনকে সম্প্রতি সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২০২২ সালের জুলাইয়ে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী তানজির আকন্দ, নিরাপত্তাকর্মী মো. রায়হান, নৈশপ্রহরী মো. মমিন এবং অফিস সহায়ক মো. কাউছারের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ করা হয়েছে।

বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম বাবুল জানান, ২০২২ সালে তাঁর ছেলে মো. বিপ্লবকে অফিস সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়ার আশ্বাসে প্রধান শিক্ষক মনির বিভিন্ন পর্যায়ের অফিস খরচ বাবদ ১ লাখ টাকা দাবি করলে তিনি একসঙ্গে সম্পূর্ণ টাকা দিয়ে দেন। বহু প্রার্থীর কাছ থেকে এভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়ে পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তানজির আকন্দকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। এখনও তাদের সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করেননি বলে তিনি দাবি করেন। এমনকি কিছুদিন আগে বিদ্যালয়ে আসা একটি তদন্ত কমিটির সামনে প্রধান শিক্ষক তাঁর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
চেংনা গ্রামের মো. হিরণ মাস্টার জানান, তিনি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকাকালে ওই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান প্রধান শিক্ষক তাঁকে পেছনের তারিখে যোগদান দেখিয়ে বেতন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
জমিদাতা আব্দুল খালেক আকন্দ জানান, ২০১০ সালের পর থেকে নিবন্ধন সনদ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সরকারিভাবে বন্ধ হয়ে গেলে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর জাল করে তাদের বহু বছর আগে নিয়োগ দেখিয়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করেছেন।

বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জানান, তিনি ২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে অবসরে যান। যে তিনজন সহকারী শিক্ষককে ২০০৪ ও ২০০৫ সালে নিয়োগপ্রত্র দেওয়া হয়েছে তাদের তিনি নিয়োগ দেননি এবং তাদের তিনি চেনেন না বলেও দাবি করেন। এ ছাড়া নিয়োগপত্রে দেওয়া স্বাক্ষরগুলো তাঁর নয় বলেও দাবি তাঁর।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদের একজন  জানান, তারা ওই বিদ্যালয়ে ২০১১ সালে নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেও নবম ও দশম শ্রেণি খোলা ও ফলাফল দেখানোর স্বার্থে তাদের ২০০৪ ও ২০০৫ সালে যোগদান দেখানো হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. মনির হোসেন জানান, এই বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে এলাকার একটি মহল উঠেপড়ে লেগেছে। মহাপরিচালক, উপপরিচালক, আদালত, সিআইডি, জেলা প্রশাসক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়সহ নানা দপ্তরে অসংখ্য লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে এখনও তদন্ত চলছে। তদন্ত কমিটির বাইরে এ নিয়ে কারও সঙ্গে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি নন। সাংবাদিকরা পত্রিকায় রিপোর্ট করেও তার কিছুই করতে পারবেন না বলে চ্যালেঞ্জ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

×