হেফাজতে ইসলামকে সরকার 'প্রশ্রয়' দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। সাম্প্রতিক সহিংসতা ও তাণ্ডবের জন্য এই প্রশ্রয়কেই দায়ী করেছেন তারা। তবে এমন মনোভাব প্রকাশ করা সত্ত্বেও তাদের প্রায় সবাই হেফাজতের অবস্থান ও কর্মকাণ্ডের বিপক্ষেই কথা বলছেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বায়তুল মোকাররম মসজিদে যে ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে, সেটার উস্কানি দিয়েছে সরকার। ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা সেদিন সাধারণ  মুসল্লিদের ওপর অত্যাচার, আক্রমণ ও হাঙ্গামা করেছেন। এটা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেদিন অনেকে গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন। তারই প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এটা সম্পূর্ণভাবে সরকারের উস্কানিতেই ঘটেছে। সরকারই এসব ঘটিয়েছে।

বিএনপির এ নেতার ভাষ্য, হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে 'কওমি জননী' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। সরকার হেফাজতকে নানা সুযোগ-সুবিধা দিলেও এখন তাদের উস্কানিতেই এসব ঘটছে।

হেফাজত প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের। তিনি সমকালকে বলেন, করোনার কারণে দলের নেতাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করতে পারেননি। আলোচনার পর হেফাজত প্রশ্নে নিজের অবস্থান জানাবে জাপা।

তবে গত ৩০ মার্চ এক বিবৃতিতে জিএম কাদের বলেছিলেন, সরকারের সঙ্গে যদি কোনো মহলের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়, তার মীমাংসা রক্তাক্ত পথে হতে পারে না। সরকারের নীতি, কর্মকাণ্ড এবং আচরণের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে- সাম্প্রতিক সময়ের আন্দোলনে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

তবে দলটির একজন কো-চেয়ারম্যান সমকালকে বলেন, জাপা নিজেকে জাতীয়বাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী দল বলে মনে করে। দলের কর্মী-সমর্থকরাও এ নীতিতে বিশ্বাসী। তাই ইসলামী সংগঠন হেফাজতের বিরোধিতা জাপার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে ভারত ও মোদির বিরোধিতা করায় হেফাজতকে খোলাখুলি সমর্থন করাও সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম হেফাজত প্রশ্নে সরকারের ভ্রান্ত নীতির কথা বলেন। তিনি মনে করেন, সরকারের ভ্রান্ত নীতির সুযোগে এ ধরনের অপশক্তি শুধু মদদ পাচ্ছে তাই নয়, তারা এখন দেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সেলিম বলেন, হেফাজতে ইসলাম আরও আগে থেকেই সহিংসতা ও ধর্মকে ব্যবহার করে অন্তর্ঘাতমূলক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় এবারও তারা একই কাজ করছে। আর সরকার এই অপশক্তিকে লালন-পালন করছে এবং বহু ক্ষেত্রে তাদের কাছে নতি স্বীকার করছে।

'মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল একটা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। যেখানে রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় এবং ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকবে। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ মেলাতে গিয়ে সেখান থেকে সরকার অনেক দূরে সরে গেছে', বলেন সিপিবি সভাপতি।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর দাবি, 'সরকারের বিভিন্ন সাহায্য-সহযোগিতার কারণে হেফাজতে ইসলাম এত শক্তিশালী হয়েছে। সরকার তাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা করেছিল, যেটা তারা করতেই পারে না। এটা করেই সরকার তাদের মাথায় উঠিয়েছে। নিজের স্বার্থেই সরকার হেফাজতকে বিপথে নিয়ে গেছে।'

ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, 'সরকার এতদিন পর হেফাজত নেতাদের দুর্নীতির হিসাব নিচ্ছে। এটা কী সরকার এতদিন জানত না? হেফাজত নেতাকর্মীরা সত্যিকার অন্যায় করলে তার বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত। তবে কাউকে রাজনৈতিক কারণে হয়রানি করা ঠিক নয়।'

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, হেফাজতে ইসলাম হচ্ছে একাত্তরের পরাজিত রাজাকার ও পাকিস্তানপন্থার নতুন সংস্করণ, বিএনপি-জামায়াতের ভাড়াটে খেলোয়াড়। বিএনপি-জামায়াত এদের তাণ্ডবে বারবার প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে এটাই প্রমাণ করেছে, হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াত-বিএনপি একই চক্র ও পরস্পরের দোসর। এরা একই সঙ্গে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মতো দুস্কর্মে লিপ্ত রয়েছে।

হেফাজত নেতা জুনায়েদ বাবুনগরী ও মামুনুল হককে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানান ইনু। একই সঙ্গে তিনি 'অপকর্মের সঙ্গী' হিসেবে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

মন্তব্য করুন