সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এনে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা আফজাল খানকে লাঞ্ছিত করেছেন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও তার ছেলে। ওই আওয়ামী লীগ নেতা আগে জামায়াত ও বিএনপি করতেন বলে জানা গেছে। তার ছেলে হেফাজতে ইসলামের সক্রিয় কর্মী। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

পরে ওই আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেন আলমকে বহিস্কার করা হয়েছে। পুলিশ তাকে আটক করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

এদিকে ধর্মপাশা থানার ওসি দেলোয়ার হোসেন, এসআই জহিরুল ইসলাম, এএসআই আনোয়ার হোসেনকে সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।

জানা গেছে, আফজাল খান ঢাবির সমাজকল্যাণ বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ও ঢাবি ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-সম্পাদক। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উপজেলার জয়শ্রী বাজারে জয়শ্রী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম এবং তার ছেলে আল মুজাহিদ ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি করে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন আফজালকে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে হাতকড়া পরিয়ে সবার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে। পরে তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধর্মীয় অবমাননার কোনো পোস্ট ফেসবুকে না থাকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। আবুল হাসেম স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের চাচাতো ভাই বলে জানা গেছে।

আফজালকে হেনস্তায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ঢাবি শাখা ছাত্রলীগ। বুধবার আবুল হাসেমকে দলীয় পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন।

জানা গেছে, জয়শ্রী ইউনিয়নের মহিষপুর গ্রামের বাসিন্দা আফজাল কয়েক দিন আগে 'ধর্মের নামে ব্যবসা' শিরোনাম দিয়ে সারাদেশে হেফাজতের তাণ্ডব ও ভাঙচুরের কিছু স্থিরচিত্র ফেসবুকে পোস্ট করেন। মঙ্গলবার বিকেলে আফজাল জয়শ্রী বাজারে এলে মুজাহিদ তার পথরোধ করে এবং এমন পোস্ট দেওয়ার কারণ জানতে চায়। এ সময় আফজাল এ পোস্টের ব্যাখ্যা দেন। কিন্তু সে ব্যাখ্যা না বুঝেই আফজালের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে তাকে কিল-ঘুসি মারতে থাকে। এ সময় আবুল হাসেম উপস্থিত হয়ে আফজালকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তালাবদ্ধ করে রাখেন। পরে আফজালের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার গুজব ছড়িয়ে বাবা-ছেলে স্থানীয় মাদ্রাসাসহ তার অনুসারীদের ফোন দেন। এতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ অনেকেই দলীয় কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হয়ে আফজালের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। পুলিশ ঘণ্টা দুয়েক পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে। আফজাল তাকে লাঞ্ছিত ও হাতকড়া পরানোর সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন।

স্থানীয়রা জানান, আবুল হাসেম এক সময় এমপি রতনের গ্রাম নওধারে পরিবার-পরিজন নিয়ে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর এই পরিবার নওধার ছেড়ে জয়শ্রী ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। আবুল হাসেম জামায়াতের সক্রিয় কর্মী ছিলেন, পরে বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে এমপি রতন তাকে আওয়ামী লীগে যোগদান করান। ২০১০ সালে তিনি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন।

তবে ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সাংসদ মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন, 'এমপিদের কত আত্মীয় বের হয়! আবুল হাসেমের বাড়ি এক ইউনিয়নে, আমার আরেক ইউনিয়নে। সে আমার চাচাতো ভাই কীভাবে হলো? সে জামায়াত, না বিএনপি করত- আমার জানা নেই। সে যখন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়, তখন আমি দলের দায়িত্বশীল পদে ছিলাম না। আফজালের ঘটনার পর আমিই জরুরি সভা ডেকে তাকে বহিস্কারের জন্য জেলা আওয়ামী লীগের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি।'

উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শামীম আহমদ মুরাদ বলেন, পত্রপত্রিকায় আবুল হাসেমের নাম দলে অনুপ্রবেশকারীর তালিকায় দেখেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য তাকে দলে এনেছেন। স্থানীয়ভাবে এলাকায় লুটেরা ও স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত এ পরিবার।

অভিযুক্ত মুজাহিদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তার বাবার দাবি, নবীজিকে নিয়ে কটূক্তি করায় স্থানীয় আলেমদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তিনি মাদ্রাসায় ফোন করেননি। তিনি কখনও জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তবে আফজালের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পুলিশকে ফোন দিয়েছেন। জয়শ্রী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মাধব চন্দ্র রায় বলেন, 'আবুল হাসেম কখনও জামায়াত, কখনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ঘটনায় আমরা লজ্জিত।'

পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, 'আফজালের ফেসবুক পোস্টে ধর্মীয় অবমাননার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। আফজালের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।' তিনি জানান, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিপ্লব বড়ূয়াসহ অনেকেই ফোন দিয়ে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য বলেছেন। তারা সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছেন। পরে ওসিসহ তিন কর্মকর্তাকে ক্লোজ করার কথা জানান তিনি।

মন্তব্য করুন