সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বুধবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর সমকাল প্রিন্ট ভার্সনে তিনি এ কলামটি লেখেন, যা পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো: 

ন্যায়বিচার প্রাপ্তি মানুষের জন্মগত ও মৌলিক অধিকার। কাউকে হত্যা করলে তার শাস্তি হলো বিচার সাপেক্ষে মৃত্যুদণ্ড; বয়স ও অন্যান্য বিষয় বিচেনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও হতে পারে। কিন্তু কোনো নিরপরাধ-নিরস্ত্র নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যা করে কোনো সভ্যতায় কোনো আইনে কেউ পুরস্কৃত হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর খুনিদের বিচার না করে বরং নানাভাবে তাদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃত করা হয়। শুধু পুরস্কৃত করাই হয়নি বরং খুনিদের যাতে বিচার না হয় সেজন্য জারি করা হয়েছিল অবৈধ ও অসাংবিধানিক ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ।

আত্মস্বীকৃত খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার আগে খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে। বঙ্গবন্ধু যেহেতু জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সুতরাং খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়ার দায়িত্ব ছিল হত্যার পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের কাছে সোপর্দ করা। কিন্তু তারা হত্যাকাণ্ড না ঠেকিয়ে বরং হত্যাকাণ্ডের পর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করেছেন। বিশ্বে অনেক মহাপুরুষ নিহত হয়েছেন অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে। কিন্তু কোথাও একই পরিবারের সব সদস্যকে একসঙ্গে হত্যার নজির নেই। যে কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচারের দায়িত্ব রাষ্ট্র নিয়ে থাকে। খুনিরা অজ্ঞাত হলেও খুঁজে বের করে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনিরা ছিল আত্মস্বীকৃত। হত্যাকাণ্ডের পর তারা প্রকাশ্যে বলেছিল 'আমরা শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি।' ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তাদের এই স্বীকারোক্তির খবর প্রকাশ হয়েছিল। এরপর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়নি; বরং ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতার হত্যার বিচার আটকে দেওয়া হয়েছিল। এ থেকে প্রমাণিত হয় এ হত্যাকাণ্ডে খন্দকার মোশতাক ও জিয়ার শুধু মৌন সম্মতিই ছিল না, বরং তারাই ছিল হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড বা কুশীলব।

জেনারেল জিয়ার কাছে যখন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের খবর পৌঁছেছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, 'সো হোয়াট, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার।' কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং কারা এ হত্যকাণ্ডের বেনিফিশিয়ারি তা তাদের পরবর্তী কার্যক্রমে স্পষ্ট হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তারা খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, বিদেশি দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। কারা এই আত্মস্বীকৃত খুনিদের পুনর্বাসিত করেছিল তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা জরুরি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পরিবারের ১৮ সদস্যসহ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল খুনিরা। তাদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারী ছিলেন, নিষ্পাপ শিশু রাসেলও ছিল। শিশু রাসেল কি রাজনীতি করেছিল? তাকে কেন হত্যা করা হলো? মূলত খুনিরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য এ নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে খন্দকার মোশতাক। ক্ষমতায় এসে ২৬ সেপ্টেম্বর ইনডেমনিটি নামে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। অনেকেই বলে থাকেন ইনডেমনিটি জারির সঙ্গে জেনারেল জিয়ার সম্পর্ক নেই! কিন্তু আমরা দেখি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ আইন হিসেবে অনুমোদন করেন। খন্দকার মোশতাকের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বৈধতা দেওয়া না হলে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক আইন প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই ১৫ আগস্টের খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যেত। জিয়াউর রহমানই ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, ভবিষ্যতে কেউ যেন ব্যবস্থা না নিতে পারে সে ব্যবস্থাও করে দেন। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পরও বিচারপতি আবদুস সাত্তার, এরশাদ এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলেও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বাতিল বা রহিত করেননি কিংবা উদ্যোগও নেননি।

বঙ্গবন্ধু হত্যকাণ্ডের বিচার যাতে কখনই না হয় সে উদ্দেশ্যে খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়া যে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করেছিল মূলত সেই অধ্যাদেশ কোনো আইন ছিল না। আমরা জানি, যখন কোনো সংসদ বিদ্যমান থাকে না বা সংসদ ভেঙে যায়, তখন রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অর্ডিন্যান্স জারি করতে পারেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর যেহেতু সংবিধান কার্যকর ছিল সুতরাং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করা হয়। তার অনুপস্থিতিতে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার আবদুল মালেক উকিল। কিন্তু ইনডেমনিটি জারি করা খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়া কেউই বৈধ রাষ্ট্রপতি ছিলেন না বা অর্ডিন্যান্স জারি করারও কোনো বৈধ এখতিয়ার তাদের ছিল না। কাজেই তারা যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল তা ছিল অবৈধ ও অসাংবিধানিক। রাষ্ট্রপতি কোনো পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাদেশ জারি করলে তার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশনে সেই অধ্যাদেশ পাস করতে হবে। কিন্তু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ কখনোই মহান জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়নি। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাংলাদেশের কোনো বৈধ রাষ্ট্রপতি জারি করেনি বা এই অধ্যাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হয়নি; সুতরাং ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ কোনো আইন ছিল না, এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তিও ছিল না।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়া থেকে আইনি বাধা অপসারণের উদ্যোগ নেয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর আইনটি সংসদে পাস হয়। ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর এটি পরিপূর্ণভাবে আইনে পরিণত হয়। ফলে মোশতাকের জারি করা এবং জিয়ার সময় বৈধতা পাওয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হয়।

মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী এই অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে ঘোচানো হয় ২১ বছরের কলঙ্ক। খুলে যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ। শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। ২০০৯ সালে লিভ টু আপিলের মাধ্যমে এ মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। আপিল শেষে বারোজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আদালত। এ মামলার বিচারকাজ চলেছে সাধারণ আইনে সাধারণ আদালতে। খুনিরা শতভাগ আইনি লড়াই ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পেয়েছিল। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি পাঁচ খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এখনও কয়েকজন পলাতক রয়েছে। সরকার পালিয়ে থাকা খুনিদের দেশে ফেরত আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। তবে এখনও এ হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ডদের পুরোপুরি চিহ্নিত করা হয়নি। কাজেই আমাদের দায়িত্ব হলো বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড বা কুশীলবদের চিহ্নিত করতে অনতিবিলম্বে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা।