ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

স্মার্টফোনে আসক্তি কমাচ্ছে বই

স্মার্টফোনে আসক্তি কমাচ্ছে বই

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: সমকাল

সোহেল মিয়া, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী)

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ১১:৩৮

আজ থেকে ৪ বছর আগে বিদ্যালয় থেকে ফিরেই স্মার্টফোনে গেম খেলতে বসত শামিম (ছদ্মনাম)। তখন সে মাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ফোনের প্রতি আসক্তি দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান শামিমের বাবা-মা। কোনোভাবেই পড়ার টেবিলে বসতে চাইত না সে। নিরুপায় হয়ে শামিমের বাবা-মা যোগাযোগ করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে। প্রধান শিক্ষক শামিমকে ১০০ টাকা দিয়ে সদস্য করে দেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কর্মসূচিতে। এরপর আর ভাবতে হয়নি শামিমের বাবা-মাকে। শামিম এখন বইয়ে আসক্ত। 

এভাবেই শামিমের মতো রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থীকে মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকে বইয়ে ফিরিয়ে আনছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি।

রাজবাড়ীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দায়িত্বরত লাইব্রেরি কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন জানান, দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মান উন্নয়নের প্রয়োজনে সৃজনশীল পঠন-পাঠন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রান্তিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নেন সরকার। এরই অংশ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির পাঠকদের চাহিদার প্রয়োজনে ও বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের জুলাই থেকে রাজবাড়ীতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয়। বালিয়াকান্দিতে ৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫৩০ জন শিক্ষার্থী এই লাইব্রেরির নিয়মিত সদস্য। আর রাজবাড়ী জেলায় সদস্য সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ২৭৫ জন। রাজবাড়ীতে এই প্রকল্পের বইয়ের সংখ্যা ৪ হাজার ৫০০টি। এর মধ্যে ২ হাজার বই পাঠক বাড়িতে নিয়ে পড়েন। বাকি ২ হাজার ৫০০ বই সবসময় গাড়িতেই থাকে। 

তিনি আরও জানান, সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি শনিবার ছাড়া অন্যান্য দিনগুলোতে বই পড়া কার্যক্রম চালু থাকে। এর মধ্যে প্রতি শুক্র, সোম ও মঙ্গলবার রাজবাড়ী সদর, বুধবার পাংশা ও কালুখালী এবং বৃহস্পতিবার বালিয়াকান্দি উপজেলায় সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত তালিকাভুক্ত বিদ্যালয়ে বই আদান-প্রদান করা হয়। 

অন্যদিকে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচির অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার সালমা ইয়ারব জানান, বালিয়াকান্দিতে ২০১২ সাল থেকে এই কর্মসূচি চালু হয়। বর্তমানে এই উপজেলার ৪১টি মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় কর্মসূচিটি চালু রয়েছে। 

বালিয়াকান্দি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী কাজী জীম ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাওসিফ তাজ জানায়, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি থেকে তারা নিয়মিত বই সংগ্রহ করে পড়ে। তাদের অনেক সহপাঠিই মোবাইল ফোনের প্রতি আসক্ত ছিল। এখন তারা নিয়মিত বই পড়ছে। 

পাইককান্দি গ্রামের বাসিন্দা অভিভাবক হাছিব মোল্লা জানান, তাঁর ছেলে মোবাইল ফোনের প্রতি ভীষণ আসক্ত ছিল। বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের পরামর্শে তিনি তাঁর সন্তানকে বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি ও ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিতে তালিকাভুক্ত করান। এখন ছেলে নিয়মিত বই পড়ে। ফোনে আসক্তি কমেছে।

বালিয়াকান্দি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুতুব উদ্দিন মোল্লা জানান, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে তরুণ প্রজন্মের আসক্তি মোবাইল ফোনের প্রতি। গ্রামাঞ্চলে বই বাড়িতে নিয়ে পড়ার সুযোগ তেমন নেই। ভালো গ্রন্থাগারের ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। এই বাস্তবতায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি চালু রেখেছে তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তাঁর বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই আজ মোবাইল ফোনের আসক্তি থেকে রক্ষা পেয়ে বইয়ে মনোনিবেশ করেছে।

বালিয়াকান্দি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পারমিস সুলতানার ভাষ্য, দিনদিন শিক্ষার্থীরা বই থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। বই পড়ার  প্রতি তাদের অনীহা। তারা ঝুঁকে পড়ছে মোবাইল ফোনের দিকে। এই প্রেক্ষাপটে আলোর দিশারি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি। এই দুটি কর্মসূচির ফলে অনেক শিক্ষার্থীরই মোবাইল ফোনের পরিবর্তে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মেছে। 

ইউএনও রফিকুল ইসলাম জানান, সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আগামী প্রজন্মকে প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আসক্তি থেকে রক্ষা করতে হলে বইবান্ধব সমাজ বিনির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই গ্রন্থাগারমুখী করা প্রয়োজন। সেই ক্ষেত্রে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইবেরি ও পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচিটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের এই কর্মসূচির সুফল যেন প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পেতে পারে সেজন্য তাদের এ কর্মসূচির বিস্তৃতি আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

আরও পড়ুন

×