পদ্মা নদীর মাওয়ার শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে সোমবার যাত্রীবোঝাই অবৈধ স্পিডবোট দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে নারী-শিশুসহ ২৬ জনের। স্বজনহারা মানুষের সেই কান্না থামেনি এখনও। লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যে স্পিডবোটে যাত্রী পারাপারের ঘটনায় মামলাও হয়েছে। তৎপরতা বেড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। এতকিছুর মধ্যেও গতকাল মঙ্গলবার পদ্মায় চলেছে যাত্রীবাহী স্পিডবোট ও ট্রলার।
গতকাল এসব নৌযান চলাচলের কথা অস্বীকার করেছেন শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী ঘাট সংশ্নিষ্ট নৌপুলিশ এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা। তবে ঘাট সংশ্নিষ্ট সূত্র এবং স্থানীয়রা বলছেন, শিমুলিয়া ঘাটের আশপাশের চর এলাকা থেকে থেমে থেমে স্পিডবোট আর যাত্রীবোঝাই ট্রলার চলাচল করেছে। শিমুলিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ছেড়ে যাওয়া এসব নৌযান মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী সংলগ্ন বাংলাবাজার চর, শরীয়তপুরের জাজিরার মাঝিরঘাট এবং নড়িয়া ঘাটের আশপাশের এলাকায় ভিড়েছে।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে চলমান লকডাউনে সরকার গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রেখেছে। সে অনুযায়ী শিমুলিয়া ঘাট থেকে পদ্মার দক্ষিণ তীর শরীয়তপুরের মাঝিরঘাট, নড়িয়া বাজার, মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ী ও বাংলা বাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চ, ট্রলার, স্পিডবোট চলাচল বন্ধ থাকার কথা। এই 'বন্ধের' মধ্যেই সোমবার সকালে শিমুলিয়া ঘাট থেকে যাত্রীবোঝাই করে একটি স্পিডবোট শিবচরের বাংলাবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সেটি কাঁঠালবাড়ী ঘাটের অদূরে নোঙর করা বালুবাহী জাহাজের (বাল্ক্কহেড) সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। এতে ২৬ যাত্রী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ওই ঘটনায় শিবচর থানায় নৌপুলিশ বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করেছে।
শিমুলিয়া ঘাট থেকে বিভিন্ন নৌযানে পার হয়ে পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে যাওয়া বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে সমকাল। ওই যাত্রীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা শিমুলিয়ার অদূরে পুরোনো মাওয়া ঘাট থেকে ট্রলারে এসেছেন। ফেরিতে বিলম্ব হওয়ায় এবং তাতে উঠতে বাধা পেয়ে জনপ্রতি ৩০০ টাকা খরচ করে ট্রলারে নদী পার হয়েছেন। এ ছাড়া মাঝনদীতে স্পিডবোট চলাচলের কথাও জানান তারা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিবচরের বাংলাবাজার ঘাটের অদূরে চরে যাত্রীবাহী অন্তত দুটি স্পিডবোট ভেড়াতে দেখেছেন স্থানীয়রা।
বাংলাবাজার নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক সমকালকে বলেছেন, সোমবারের ঘটনায় লাশ হস্তান্তর ও মামলার তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এবং তাদের জনবল কম থাকায় মাঝনদী কিংবা আশপাশের চরগুলোতে নজরদারি করতে পারেননি। তবে ঘাট থেকে কোনো স্পিডবোট ও ট্রলার ছেড়ে যায়নি এবং ভিড়তেও পারেনি।
নৌপুলিশের এই কর্মকর্তার দাবি- পদ্মা সেতু প্রকল্পের অনেক ধরনের কাজ চলছে। যেসব স্পিডবোট চলাচল করতে দেখা গেছে, সেগুলোতে হয়তো বিদেশি প্রকৌশলী বা শ্রমিকরা যাতায়াত করেছেন।
শিমুলিয়া ঘাটের একটি সূত্র জানিয়েছে, গতকাল সরাসরি কোনো স্পিডবোট না ছাড়লেও অনেক যাত্রী ঢাকা থেকেই পূর্বপরিচিত মালিক ও চালকদের সঙ্গে চুক্তি করে ঘাটে আসছেন। এরপর সুযোগ বুঝে তারা নদীতীরের বিভিন্ন নিরাপদ স্থান থেকে স্পিডবোটে উঠে দক্ষিণে নজরদারির বাইরে থাকা তীরে নেমে যাচ্ছেন। একইভাবে ট্রলারও চলছে।
শিমুলিয়া ঘাটটি নৌপুলিশের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে পড়েছে। একদিন আগে এতবড় দুর্ঘটনার পরও ওই এলাকা থেকে কীভাবে যাত্রী নিয়ে অবৈধ স্পিডবোট ও ট্রলার ছেড়ে যাচ্ছে, তা জানতে নৌপুলিশের নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদার সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হয়। শিমুলিয়া ঘাটে দায়িত্বরত নৌপুলিশের পরিদর্শক সিরাজুল ইসলামের সরকারি মোবাইল ফোনেও একাধিকবার কল দেওয়া হয়। তবে এই দুই কর্মকর্তা ফোন ধরেননি। অবশ্য বিআইডব্লিউটিএ শিমুলিয়া ঘাটের সহকারী পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগ) শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেছেন, মঙ্গলবার ঘাট বা আশপাশের এলাকা থেকে ট্রলার বা স্পিডবোট ছেড়ে যাওয়ার তথ্য তাদের কাছে নেই।
তবে এসব বাহনে নদী পার হওয়া যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে তাকে জানালে এই কর্মকর্তা বলেন, নৌ নিরাপত্তা ও অবৈধ নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণে তাদের সংস্থা ছাড়াও নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড ও জেলা প্রশাসনের লোকজন দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তারা শুধু ঘাটের বিষয়টি দেখভাল করেন। কিন্তু ঘাট থেকে এসব যান ছাড়ার সুযোগ নেই। মঙ্গলবার ঘাটে থানা পুলিশেরও টহল ছিল।
২৬ মৃত্যুর ঘটনায় মামলার আসামি চারজন :সমকালের মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি ও মাদারীপুর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সোমবারের স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানির ঘটনায় নৌ পুলিশ বাদী হয়ে ওইদিন রাতেই শিবচর থানায় মামলা করেছে। এতে দুর্ঘটনায় পড়া স্পিডবোটের চালক শাহ আলম, দুই মালিক চান্দু মোল্লা ও রেজাউল ইসলাম এবং শিমুলিয়া ঘাটের ইজারাদার শাহে আলমকে আসামি করা হয়েছে। বাল্ক্কহেডের কাউকে আসামি করা হয়নি।
শিবচর থানার ওসি মিরাজ হোসেন জানিয়েছেন, বেপরোয়া গতিতে নৌযান চালিয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় ওই মামলা হয়েছে। মামলাটি নৌপুলিশই তদন্ত করবে। এরই মধ্যে দুর্ঘটনার পর আটক স্পিডবোট চালক শাহ আলমকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছে। অন্য আসামিদেরও গ্রেপ্তারে পুলিশের বিভিন্ন বিভাগ কাজ করছে।
দুর্ঘটনায় অভিযুক্ত বাল্ক্কহেডের কাউকে আসামি না করার বিষয়ে নৌপুলিশের বাংলাবাজার ফাঁড়ির পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাল্ক্কহেডটি নদীতীরে নোঙর করা ছিল। সেটিতে গিয়ে স্পিডবোটটি ধাক্কা খেয়ে এর নিচে চলে যায়। এতে বাল্ক্কহেডের চালক বা সেটিতে থাকা কারও অপরাধ নেই।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, স্পিডবোট চালক মাঝনদী রেখে কেন তীরে গিয়েছিল, সে বিষয়টি তদন্ত চলছে। তীরে না গেলে এতবড় দুর্ঘটনা ঘটত না। হয়তো চালক পুরোপুরি অদক্ষ বা মাদকাসক্ত ছিল। পুরো বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

মন্তব্য করুন