করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত জনজীবন। স্থবির হয়ে পড়ছে জীবনের গতিও। এরই মাঝে চলছে জীবিকার সংগ্রামও। হালদাপাড়ে করোনার এ আকালেও দেখা মিলছে নতুন প্রাণের। জেলেদের কেউ তৈরি করছেন মাটির কুয়া। কেউ বুনছেন জাল। ডিম সংগ্রহে ব্যবহূত হওয়া নৌকাটাকেও শেষবারের মতো ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন কেউ কেউ। করোনাকে হটিয়ে হালদাপাড়ে এমন নবপ্রাণের স্বপ্ন দেখছেন সহস্রাধিক জেলে। তারা এখন অপেক্ষায় আছেন টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও মেঘের গর্জনের জন্য। কারণ, এই তিনের সমন্বয় হলেই আসবে তিথি। তিথি আসা মানে হালদাপাড়ে ডিম উৎসব শুরু হওয়া।
ডিম রাখার জন্য দুই পদ্ধতিতে কুয়া তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তুত করা হয়েছে ডিম থেকে রেণু ফোটানোর পাত্রও। জেলেদের প্রত্যাশা- রুই, কার্প, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ জাতীয় মা মাছ থেকে এবার সর্বোচ্চ পরিমাণে ডিম পাবেন তারা। ডিম থেকে ফোটানো রেণু এবার বিক্রিও করতে পারবেন তারা সর্বোচ্চ দরে। মাছের ডিম সংরক্ষণ করার জন্য এবার সরকারি ৬টি হ্যাচারিতে গোলাকার ও আয়তাকার মিলে মোট ১৪৮টি সিমেন্টের কুয়া তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে হাটহাজারী অংশে ২৮টি গ্রুপে ৮৩টি, রাউজানে ৩৪ গ্রুপে ৮৪টি ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইডিএফ তৈরি করছে ৮টি মাটির কুয়া। সব মিলিয়ে এবার হালদায় ১৭৫টি মাটির কুয়া তৈরি করার কাজ শেষ হয়েছে। প্রতিটি কুয়া তৈরিতে ৫-৬ হাজার টাকা খরচ হয়।
এর মধ্যে আইডিএফ প্রতিটি গ্রুপকে এক হাজার টাকা করে ৬২ হাজার টাকা অর্থায়ন করেছে। প্রতিটি গ্রুপকে তারা একটি বালতি, একটি গামলা ও একটি মগ দিয়েছে।
হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, 'দক্ষিণ এশিয়ায় হালদাই একমাত্র নদী, যেখানে মা মাছেরা প্রতি বছর এই মৌসুমে ডিম ছাড়তে আসে প্রাকৃতিক উপায়ে। সংগৃহীত এই ডিম ১৮ থেকে ২২ ঘণ্টার মধ্যে রেণু হয়। এরপর প্রতি কেজি রেণু ৪০ হাজার থেকে লাখ টাকায় বিক্রি করেন জেলেরা।' গত বছর হালদা থেকে রেকর্ড পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করা হয়। তিনি জানান, হালদা নদীর রেণু গুণগতমানের দিক থেকে সবার সেরা। অন্য কোনো উৎসের রেণু বছরে সর্বোচ্চ ১ কেজি পর্যন্ত হলেও হালদা নদীর রেণু বড় হয় এর তিনগুণ বেশি। এজন্য হালদার রেণুর চাহিদা বেশি; দামও বেশি। হালদাপাড়ে সরেজমিন গিয়ে এবার ডিম আহরণকারীদের আগাম প্রস্তুতি দেখা গেছে। ডিম থেকে রেণু ফোটাতে কেউ কেউ নদীর তীরে মাটির কুয়া তৈরি করছেন। এ ধরনের কুয়া সাধারণত দৈর্ঘ্যে ১৫ ফুট ও প্রস্থে হয় ১০ ফুট। আবার সরকারিভাবে কংক্রিট দিয়ে চার কোণার কিছু কুয়া তৈরি করে দেওয়া হয়েছে জেলেদের।
হাটহাজারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা রনি জানান, হাটহাজারীর ৩টি হ্যাচারির ১২২টি কুয়া ডিম ফোটানের জন্য প্রস্তুত আছে। ইতোমধ্যে আবেদনের ভিত্তিতে ১১৩টি কুয়া ডিম আহরণকারীদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪৫টি কুয়াও বরাদ্দ দেওয়া হবে। এছাড়া হাটহাজারী অংশে ব্যক্তি উদ্যোগ ও আইডিএফের সহযোগিতায় ৮৩টি মাটির কুয়াও প্রস্তুত আছে। আইডিএফে কর্মরত সহকারী ভেলিট্যান্ট ফেসিলিটেটর মিমু দাশ জানান, তারা রাউজান উপজেলার পশ্চিম বিনাজুরি বড়ুয়াপাড়ায় ৮টি মাটির কুয়া, ১০টি আয়তাকার কুয়া, ৫টি গোলাকার তৈরি করেছেন। এ ছাড়া হাটহাজারী অংশে ৮৩ ও রাউজান উপজেলায় ৮৪টি মাটির কুয়া ডিম আহরণকারীরা প্রস্তুত রেখেছেন।
জানা গেছে, ডিম সংরক্ষণের বেশিরভাগ কুয়া আগে নষ্ট থাকায় তার সুফল পাচ্ছিলেন না জেলেরা। গত দুই বছর ধরে এ চিত্র পাল্টে গেছে। হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, 'কুয়ার সুবিধা যথাযথভাবে না পাওয়ায় এতদিন সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু ফোটাতে হিমশিম খেতেন জেলেরা। নষ্ট হয়ে যেত তাদের রেণু। তাই হাটহাজারী অংশে উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে অর্ধশতাধিক কুয়া সংস্কার করা হয়েছে। নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে গত আড়াই বছরে ১৬৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছি। এসব অভিযানে অবৈধভাবে উত্তোলিত ১১ হাজার ঘনফুট বালু জব্দ করি। হালদা নদীতে মাছ ধরার জন্য পাতা প্রায় ৩ লাখ মিটার ঘেরাজাল জব্দ করি। হালদা নদীতে অবৈধভাবে ঘেরাজাল বসানোর কাজে ব্যবহূত ৬টি নৌকা ও প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার বালু উত্তোলনে ব্যবহূত পাইপ ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া হালদা দূষণের দায়ে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার পিকিং পাওয়ার প্লান্ট ও এশিয়ান পেপার মিল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।' রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ বলেন, 'রাউজান উপজেলা প্রশাসন হালদা থেকে মাছ চুরি, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে। রাউজান অংশে ডিম আহরণকারীরা যাতে নির্বিঘ্নে ডিম আহরণ করে তা ফোটাতে পারে ও বিক্রি করতে পারে সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।'
হালদাপাড়ের বাসিন্দা রাউজান উপজেলার অঙ্কুরীঘোনার উদয়ন বড়ুয়া মাটির কুয়া তৈরি করেন ২টি। ২টি কুয়া তৈরিতে তার ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। গত বছর আহরণ করা ডিম থেকে ফোটানো ৪ দিন বয়সী ৩ কেজি ২শ গ্রাম রেণু বিক্রি করেছেন তিনি। অনুকূল আবহাওয়া এবং সবকিছু ঠিক থাকলে ও আশানুরূপ ডিম পেলে এবারও মাটির কুয়াতে ডিম ফোটাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হালদাপাড়ে উৎসব ধরে রাখতে হাটহাজারীর রামদাশ মুন্সীহাট এলাকায় একটি নৌ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। এখানে একজন এসআইয়ের নেতৃত্বে ১১জন পুলিশের একটি টিম হালদা নজরদারি করছে। নজরদারির জন্য ওই ফাঁড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। যেখানে হালদা নদীর মদুনাঘাট থেকে আমতোয়া পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার এলাকায় বিভিন্ন পয়েন্টে ৮টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

বিষয় : হালদাপাড়ে নবপ্রাণ

মন্তব্য করুন