লকডাউনের মধ্যে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ার শিমুলিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়া স্পিডবোটের চালক শাহ আলম নিয়মিত মাদক সেবন করতেন। অবৈধভাবে ৩১ জন যাত্রীকে বহনের সময়ও তিনি ছিলেন মাদকাসক্ত। ডোপ টেস্টে তার শরীরে নিয়মিত গাঁজা ও ইয়াবা সেবনের প্রমাণ পেয়েছেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎকরা। এদিকে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দুর্ঘটনার দিন দায়িত্বরত সবার চোখের সামনে থেকেই শিমুলিয়া ঘাটের পন্টুন থেকে স্পিডবোটটি ছেড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক ও তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য মিলেছে।

গত সোমবার শিমুলিয়া ঘাট থেকে স্পিডবোটটি অবৈধভাবে ৩১ জন যাত্রী নিয়ে শিবচর উপজেলার বাংলাবাজারের ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সেটি কাঁঠালবাড়ী পুরোনো ঘাটের অদূরে গেলে পদ্মা নদীর দক্ষিণ তীরে নোঙর করা বালুবাহী বাল্ক্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুমড়েমুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান নারী ও শিশুসহ ২৬ যাত্রী। ঘটনাস্থল থেকে আহত অবস্থায় আটক করা হয় চালক শাহ আলমকে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশ পাহারায় তার চিকিৎসা চলছে।

ওই দুর্ঘটনার পর নৌ পুলিশ বাদী হয়ে শিবচর থানায় শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটের ইজারাদার শাহে আলম খান, স্পিডবোটের দুই মালিক চান্দু মোল্লা ও রেজাউল ইসলাম এবং চালক শাহ আলমকে আসামি করে মামলা করা হয়। তবে চালক ছাড়া অন্য কোনো আসামিকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মাদারীপুর জেলা প্রশাসন গঠিত একটি তদন্ত কমিটি ওই দুর্ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে।

মামলার তদন্ত সংশ্নিষ্ট নৌ পুলিশ সূত্র এবং মাদারীপুর জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি সূত্র দুর্ঘটনায় পড়া স্পিডবোট চালকের মাদকাসক্তির বিষয়ে নিশ্চিত করেছে। বিষয়টি আরও নিশ্চিত হতে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা শশাঙ্ক চন্দ্র ঘোষের সঙ্গেও সমকালকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্পিডবোট চালক শাহ আলমের ডোপ টেস্ট করাতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর ঢাকা থেকে কিট এনে তার ডোপ টেস্ট করা হয়। এতে তার শরীরে মাদকের উপস্থিতি পজিটিভ এসেছে। নমুনায় গাঁজা ও ইয়াবার অস্তিত্ব মিলেছে। ঘটনার সময়েও চালক মাদকাসক্ত ছিলেন।

জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান স্থানীয় সরকার বিভাগের মাদারীপুরের উপপরিচালক আজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ওই স্পিডবোট থেকে বেঁচে যাওয়া যাত্রী, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও এখন পর্যন্ত তদন্তে পাওয়া তথ্য বিশ্নেষণ করে তারা দেখেছেন, দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটটি শিমুলিয়া ঘাটের পন্টুন থেকে ছাড়া হয়েছিল। এজন্য যাত্রীদের টিকিটও দেওয়া হয়। প্রতি যাত্রী থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, বিধিনিষেধের মধ্যে স্পিডবোট চলাচলে সিন্ডিকেটের তথ্যও তদন্ত কমিটির হাতে এসেছে। তবে সীমানার কারণে তারা চাইলেই শিমুলিয়ায় গিয়ে তদন্ত করতে পারবেন না। মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি হলে বিস্তারিত তদন্ত করবে। তারা শুধু দুর্ঘটনার কারণটি উদ্ঘাটন করবেন।

এদিকে তদন্ত কমিটি সাক্ষ্য নেওয়া শুরু করেছে। কমিটির কাছে বাংলাবাজার স্পিডবোট মালিক সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হাওলাদার সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, লকডাউনের পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাবাজার ঘাট থেকে স্পিডবোট ছাড়েনি। দুর্ঘটনাটি দক্ষিণপাড়ে হলেও যাত্রীরা কীভাবে শিমুলিয়ার পন্টুন থেকে উঠল; নৌ পুলিশ বা বিআইডব্লিউটিএ কী করছিল- এসব নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। এতে মূল দোষীরা পার পেয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, শিমুলিয়া ঘাটের সব নিয়ন্ত্রণ আশরাফ খান করে। পরিস্থিতি উন্নয়নে তিনি তাকে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সাড়া পাননি।

সোনা মিয়া নামে এক স্পিডবোট চালক বলেন, লকডাউনে বাংলাবাজার ঘাটে কড়াকড়ি থাকলেও শিমুলিয়া ঘাটে তা নেই। ওই ঘাটে আশরাফ খানই সব। তার লোকজন বসা থাকে সেখানে। পুলিশ-বিআইডব্লিউটিএর সামনেই যাত্রী ওঠানো হয়। যাত্রীপ্রতি ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়া নিলেও যাত্রীপ্রতি বোট নির্ধারিত ১০০ টাকা করেই পান তারা।

অন্য একজন স্পিডবোট চালক কুটি মিয়া বলেন, শিমুলিয়া ঘাটে আশরাফ খানের লোকজনের ওপরে কারও কথা বলার সাহস নেই। ৩০০ টাকা করে যাত্রী তুলে দিয়ে চালকদের যাত্রীপ্রতি ১০০ টাকা দেওয়া হয়।

এদিকে আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাংলাবাজার নৌ ফাঁড়ির পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আসামিদের সবাই মুন্সীগঞ্জের। তাদের ঠিকানা বের করতেই সময় চলে গেছে। এখন তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানও চলছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, সোমবার ভোরে স্পিডবোটটি শিমুলিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময়ে ওই ঘাটে নৌ পুলিশ, বিআইডব্লিউটিএর লোকজনের দায়িত্ব পালন করার কথা। কিন্তু বিধিনিষেধের মধ্যেও যাত্রীবাহী স্পিডবোট ছেড়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে কেউ বাধা দেয়নি। তা ছাড়া ঘাট ইজারাদার শাহে আলম খান প্রভাবশালী। তার নামে ঘাটের ইজারা থাকলেও তার ভাই আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফ খানের প্রভাবেই শিমুলিয়ায় সবকিছু চলে। এজন্য সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা অনেকটা জোর করেই ঘাট থেকে স্পিডবোট ছাড়ার অনুমতি দেয়। ওই দুই ভাইয়ের নিয়োজিত লোকজন ঘাটে পাহারা বসিয়ে স্পিডবোট ছাড়ার ব্যবস্থা করে। আশরাফ খান লৌহজং উপজেলার মেদিনীমণ্ডল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ওই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ইজারাদার শাহে আলম খানকে কয়েক দফা ফোন দিলেও তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তার ঘনিষ্ঠ একজন জানিয়েছেন, মামলার আসামি হওয়ার পর শাহে আলম মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছেন। তার ভাই আশরাফ খানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে ফোন দিয়ে এবং এসএমএস পাঠালেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

মন্তব্য করুন