সুন্দরবনে আগুন লেগেছে এবং সহজে আগুন নেভানো যাচ্ছে না- বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই দুটো খবর পড়ে চিন্তিত হলাম। আগুন নেভাতে চার-পাঁচ দিন লেগে যাচ্ছে। সুন্দরবনের বাইরে থেকে 'ফায়ার ব্রিগেড' টিম নিয়ে আসতে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে ধরে নিতে পারি যে, সুন্দরবনের মধ্যে দমকলের কোনো কেন্দ্র নেই। তাহলে এখন দুটি প্রশ্ন করতে হয়। প্রথমত, আগুন কেন লাগল অথবা কীভাবে আগুন লাগতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো, কীভাবে আগুন নেভানো যাবে এবং কে আগুন নেভানোর দায়িত্ব নেবে। আসুন এ প্রশ্ন দুটির উত্তর খুঁজি।
সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক বন। সুন্দরবন অন্যান্য প্রাকৃতিক বনের মতো নয়। এটি একটি জলাভূমিও বটে। উপকূল অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই বনটি জোয়ারের সময় বহুলাংশে পানির তলে ডুবে যায়। অমাবস্যা-পূর্ণিমায় ১৪ দিন পর পর ভরা কটালের সময় প্রায় অধিকাংশ এলাকা ডুবে যাওয়ার কথা। শুকনো মৌসুমে জোয়ারের উচ্চতা কম থাকে। বর্ষার প্রারম্ভে দখিনা বাতাসের প্রভাবে জোয়ারের উচ্চতা বাড়ে। এ বছর এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। অর্থাৎ এখন থেকে পুরো বর্ষার সময় অমাবস্যা-পূর্ণিমার জোয়ারে সুন্দরবনের বহুলাংশ কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও পানির তলায় থাকার কথা। এমন পরিস্থিতিতে আগুন লাগার কারণ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
তিনটি সম্ভাব্য কারণ মনে হচ্ছে- প্রথমত, প্রাকৃতিকভাবেই আগুন লেগেছে। এটা হতে পারে, কারণ এ বছর খুব শুকনো সময় যাচ্ছে। গত চার-পাঁচ মাস বৃষ্টি হয়নি। বনের যে জায়গাগুলো একটু উঁচু, সেখানে শুকনো পাতা ইত্যাদি জমে আগুন লাগার কারণ ঘটতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুকনো বনভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে আগুন লাগার বহু ঘটনা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে গত কয়েক বছর ধরে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। বাতাসের প্রভাবে আগুন বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে এবং আগুন নেভানোর জন্য কিংবা আগুনের বিস্তার ঠেকানোর জন্য বহু ব্যয়বহুল পন্থা অবলম্বন করতে হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। ইউরোপের উত্তরে ফিনল্যান্ড কিংবা নরওয়েতে এ ধরনের আগুন লাগার খবর পড়েছি। আমাদের এখানে সে কারণেই কি আগুন লাগল? বন বিভাগের বহু কর্তাব্যক্তির এ ধরনের বক্তব্যের কথা শুনেছি।
আগুন লাগার দ্বিতীয় কারণটি হতে পারে অসাবধানজনিত। সুন্দরবনের ভেতরে বিভিন্ন কারণে যাতায়াতকারী মানুষের অসাবধানতাবশত আগুন লেগে থাকতে পারে। সুন্দরবন গহিন বন হলেও বিভিন্ন কাজে বা উদ্দেশ্যে বহু মানুষ আনাগোনা করে। আইনসম্মতভাবে মাছ ধরার জন্য, গোলপাতা আহরণের জন্য, মধু সংগ্রহের জন্য কিংবা জ্বালানি কাঠ আনার জন্য উপযুক্ত কাগজ সংগ্রহ করে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বহু মানুষ। তাদের সম্পর্কে তথ্য বন বিভাগের কাছে পাওয়া যাবে।
আমার ধারণা, সুন্দরবনে আইনিভাবে প্রবেশকারীদের চেয়ে বেআইনিভাবে প্রবেশকারীর সংখ্যা বেশি হতে পারে। হয়তো আইনিভাবে প্রবেশকারী লোকজন কিংবা বেআইনিভাবে অবস্থানকারীদের মধ্যে কেউ অসাবধানে বিড়ি বা সিগারেট থেকে আগুন সৃষ্টির কারণ ঘটিয়েছে। সুন্দরবনে রাত্রিযাপন করেন এ রকম লোকের সংখ্যাও কম নয়। তাদের মাধ্যমেও আগুন লাগতে পারে। বনেই হোক বা বনের বাইরে বাসাবাড়ি হোক কিংবা নগরীতে হোক- আগুন মূলত অসাবধানতা থেকেই লাগে। কাজেই বনে যারা যাতায়াত করবেন, তাদের সাবধান করতে হবে এবং তাদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তবে স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে, বন বিভাগের প্রয়োজনীয় লোকবল ও ভৌত সুযোগ-সুবিধা নেই। ভৌত এই সুবিধা বলতে আমি প্রাথমিকভাবে পর্যাপ্ত 'ওয়াচ টাওয়ার' থাকার কথাও বলছি। শুধু ওয়াচ টাওয়ার থাকলে চলবে না, সেখানে থেকে 'ওয়াচ' করার জন্য জনবলও প্রয়োজন হবে।
আগুন লাগার তৃতীয় কারণটি হতে পারে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাটি ঘটানো। আগুন লাগিয়ে দিলে বড় একটি জায়গা আগুনে পুড়ে যাবে এবং ওই এলাকার কাঠ কেটে আনার নামে আশপাশ থেকে ভালো গাছগুলোও কেটে ফেলা যাবে। এমন আশঙ্কার কথা বাতিল করা যায় না; কারণ অতীতে এমন নজির দেখা গেছে। তবে আমি বন বিভাগের দেওয়া ব্যাখ্যা সামনে রেখেই এগোতে চাই। বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে। তারা অত্যন্ত দক্ষ। বন ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণে তাদের জ্ঞানের পরিধির বিষয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। তাদের দক্ষতার ঘাটতি না থাকলেও কর্মক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা বিভিন্ন কারণে সম্ভব হয় না। এই কারণগুলো চিহ্নিত করে ভাবার সময় এসেছে।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রশ্নে। আগুন কে নেভাবে? আমার উত্তর হলো, এ দায়িত্ব বন বিভাগকেই পালন করতে হবে। কোথাও আগুন লাগলে নিকটস্থ দমকল কেন্দ্র থেকে যন্ত্রপাতিসহ ঘটানস্থলে পৌঁছতে অনেকটা সময় লেগে যেতে পারে। উপযুক্ত যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে এবং প্রাথমিক কিছু প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ ব্যাপারে সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। বন বিভাগকেই এ কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব নিতে হবে।
সুন্দরবনে আগুন লাগার পরবর্তী সময়ে দগ্ধ এলাকার 'পুনর্বাসন' বিষয়ে আমি জোর দিয়ে একটি কথা বলতে চাই। প্রাকৃতিক বন- প্রাকৃতিকভাবেই হোক বা অন্য কোনো উপায়েই হোক তা পুনর্বাসনের কোনো চেষ্টা করা উচিত নয়। প্রকৃতি নিজেই এই পুনর্বাসন কাজ করে নেবে। সুন্দরবনে আগুন লেগে যে কাঠ পুড়ে গেছে, সেগুলোকে সেখানেই থাকতে দিন। ছয় মাসের মধ্যে নতুন পাতা বের হয়ে পুড়ে যাওয়া কালো জায়গা সবুজে ঢেকে যাবে। আশপাশ থেকে লতা-গুল্ম এসে জায়গাটি আচ্ছাদিত করে দিতে পারে।
সুন্দরবনের ভেতরে বহু নদী-নালা, খাল-বিল আছে। সুন্দরবনের যে কোনো জায়গা থেকে দুই-তিন কিলোমিটারের মধ্যে একটি বড় খাল বা ছোট নদী পাওয়া যাবে। অর্থাৎ বনে আগুন লাগলে তা নদী বা খালের পাড়েই আটকে যাওয়ার কথা। কাজেই আগুনে আক্রান্ত হওয়ায় বেশি বড় জায়গা পুড়ে যাওয়ার কথা নয়। আক্রান্ত এলাকা থেকে বন্য পশু-পাখি অন্যত্র সরে যাওয়ার কথা। ক্ষতি যা হওয়ার, তা হয় মূলত গাছপালার। শুনতে পাচ্ছি, এবারের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতির পরিমাণ অনুমিত হয়েছে ১২ লাখ টাকা। আমি বলব, এই 'ক্ষতি' মেনে নিন। ওই ১২ লাখ টাকা থেকে দুই-তিন লাখ টাকা 'উদ্ধার' করার নামে বনের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন। বরং বনকে প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দিন। প্রকৃতিই তার ক্ষতি নিজে নিজে পূরণ করে নেবে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি পূরণের দায় প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষেই মত দেবে বাংলাদেশ সরকারের বন বিভাগ। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের আঘাতে সুন্দরবন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখনও আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম, ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বন পুর্নবাসনের দায়িত্ব প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক। বন বিভাগ সে পরামর্শ শুনেছিল, আমরা সুফল পেয়েছিলাম। সিডরের ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক আঘাত থেকে সুন্দরবন নিজে নিজে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। সে তুলনায় সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড নস্যিও নয়।
পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ; ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন