ঈদের দিন দুপুরে নগরীর ধোপাদিঘীর পাড়ের ওসমানী শিশু উদ্যানের সামনে শত মানুষের ভিড়। নানা বয়সের মানুষ রঙিন পোশাক পরে বাইরে দাঁড়িয়ে গেট খোলার অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; খোলেনি 'শিশু পার্ক' নামে পরিচিত ওসমানী উদ্যানের ফটক। নগরীর উপকণ্ঠ হিলালপুরের ড্রিমল্যান্ড, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন অ্যাডভেঞ্চার পার্কে গিয়েও অনেকে বিফল হয়েছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এবারেও খোলেনি পার্ক-উদ্যানের ফটক। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন চায়ের রাজ্য। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অনেকে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতেও ঘুরতে গেছেন।

সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে পার্ক-উদ্যান বন্ধ থাকায় ঈদের ছুটিতে সিলেটে হাজারো মানুষ ছুটে গেছেন নগরী সংলগ্ন চা বাগানে। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মালনীছড়া, লাক্কাতুরা, তারাপুর চা বাগানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সবুজে ঘেরা সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের সামনের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, আড্ডার পাশাপাশি অনেকে সেলফি তুলেছেন প্রিয়জনের সঙ্গে। এখানে চটপটি-ফুচকার পসরা সাজিয়ে বসা হকারদের ঘিরেও রাত পর্যন্ত চলেছে আড্ডা। পর্যটন কেন্দ্রের বদলে ভ্রমণপ্রিয় মানুষ চা বাগানের সবুজের সমারোহে আনন্দে অবগাহন করেছেন। ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, জাফলং, বিছনাকান্দিতেও গেছেন অনেকে।

লাক্কাতুরা চা বাগানে ঘুরতে আসা নগরীর সুবিদবাজারের বাসিন্দা ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান বলেন, প্রত্যেক ঈদে পরিবারের লোকজনকে নিয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাই। করোনার কারণে দুই বছর ধরে তা হচ্ছে না। কিন্তু ঈদের সময় একেবারে ঘরে বসে থাকতেও ভালো লাগে না। তাই একটু আনন্দের জন্য চা বাগানেই ঘুরতে এলাম।

শনিবার পরিবার নিয়ে চা বাগানে ঘুরতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা লাবনী আক্তার বলেন, করোনার জন্য বাচ্চারাও দীর্ঘদিন ঘরে থেকে একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই সবাইকে নিয়ে বিকেলে একটু চা বাগানে এসেছি। তারাপুর চা বাগান সংলগ্ন নগরীর গুয়াবাড়িতে খালের পারের ওয়াকওয়েতেও অনেকে ভিড় করেন।

সুরমা নদীর ওপরে নগরীর কাজিরবাজার এলাকার 'সেলফি সেতু'তেও আনন্দের খোঁজে ছুটে যান অনেকে। শনিবার সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে সরেজমিন শত শত মানুষকে ভিড় করতে দেখা গেছে। লাক্কাতুরা চা বাগান লাগোয়া স্টেডিয়ামে প্রবেশপথের দুই পাশে চটপটি-ফুচকাওয়ালাদের পাশাপাশি বাহারি খেলনা নিয়ে অনেক হকার বসেছেন। কিছু দোকান থেকে গানবাজনার শব্দও ভেসে এসেছে। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই সেখানে বেশি। সব মিলে পুরো এলাকা পরিণত হয়েছে অস্থায়ী বিনোদন কেন্দ্রে। একইভাবে নগরীর কিস্ফন ব্রিজের নিচে সার্কিট হাউসের সামনে ঈদের দিন বিকেলে নগরবাসী ঘুরতে এসেছেন; পরবর্তী দু'দিন তা অব্যাহত ছিল।

সামাজিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করার পাশাপাশি অনেকে মাস্ক পরার কথা বিবেচনায়ও আনেননি। এসব জায়গায় প্রশাসনের কোনো তৎপরতাও লক্ষ্য করা যায়নি। নগরীর কিস্ফন ব্রিজের নিচে ঘুরতে আসা সজীব আহমদ নামে একজন বললেন, হঠাৎ বন্ধুর ফোন পেয়ে চলে এসেছি। তাই মাস্ক আনার কথা মনে ছিল না। নগরীর তারাপুর চা বাগানে ঘুরতে আসা মো. আশিক বলেন, সারাক্ষণ মাস্ক পরতে ভালো লাগে না। একটু আনন্দ করতে এসেছি। তাই মাস্ক পরিনি। তিনি বলেন, দুই ডোজ টিকা নিয়েছি। তাই একটু সাহসও পাচ্ছি। পার্শ্ববর্তী দেশের করোনা পরিস্থিতিতে ভয় পাচ্ছেন বলে জানালেন উম্মে কুলসুমা নামে এক চাকরিজীবী।

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঈদের দিন থেকেই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর, গোয়াইনঘাটের জাফলং, বিছনাকান্দি ও জৈন্তাপুরের লালাখালের মতো পর্যটন কেন্দ্রে অনেকে ঘুরতে গেছেন। অবশ্য বিধিনিষেধের কারণে অন্যবারের চেয়ে লোকসমাগম কম হলেও অধিকাংশের মুখে মাস্ক ছিল না; সামাজিক দূরত্বেরও বালাই ছিল না। সিলেট নগরীর আম্বরখানার বাসিন্দা সোলেমান আহমদ ঈদের পরদিন পরিবার নিয়ে বিছনাকান্দিতে বেড়াতে যান। তিনি বলেন, এখানে যে ভিড় হবে, তা বুঝতে পারিনি। ঈদের দিন বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ যান ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে বেড়াতে। পরদিন শনিবার পর্যটকের সংখ্যা হয়েছে কয়েক গুণ। নগরীর হোটেল-মোটেল বন্ধ থাকায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মূলত সিলেটসহ আশপাশের জেলার মানুষ ঘুরতে এসেছেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন আচার্য ও গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিলুর রহমান জানান, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আগত সবাই স্থানীয় বাসিন্দা। তারা বলেছেন, চলমান কঠোর বিধিনিষেধের কারণে বাইরের জেলা থেকে কেউ আসতে পারেনি।

ইউএনও তাহমিলুর রহমান বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জনসমাগম এড়াতে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় কয়েক মাস থেকে পুরোপুরি পর্যটকশূন্য ছিল জাফলং ও বিছনাকান্দি এলাকা। এবারের ঈদেও আমরা পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে নিরুৎসাহিত করছি।

অন্যদিকে ইউএনও সুমন আচার্য বলেন, পর্যটক যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ নজরদারি রেখেছি। এ জন্য স্থানীয় লোকজন ছাড়া বাইরের মানুষের যাতায়াত নেই। রোববার অবশ্য পর্যটকদের জাফলং যেতে দেওয়া হয়নি। জাফলংগামী পর্যটকদের গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।



বিষয় : ঈদ সিলেট

মন্তব্য করুন