পিতৃহীন রুবেল মায়ের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে। ওই সময় তার বয়স ছিল সাত বছর। ছেলের বাড়ি ছাড়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে তখন মামলার ফাঁদ পাতেন তার মা রহিমা বেগম। জমি নিয়ে বিরোধ থাকা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছেলেকে অপহরণ ও গুমের মিথ্যা অভিযোগ আনেন তিনি। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে করা মামলায় স্থানীয় দুই মুক্তিযোদ্ধাসহ ১৯ জনকে আসামি করা হয়। ওই মামলায় ছয়-সাতজন জেলও খেটেছেন। তবে ১৪ বছর পর গত বুধবার রাতে বাড়ি ফিরে এসেছেন রুবেল ওরফে আল আমিন। এখন তিনি ২১ বছরের তরুণ। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ইউনিয়নের কুঁড়েরপাড়ের দক্ষিণ ক্রকের চর এলাকায়।

রুবেল ফিরে আসার পর ফাঁস হয় তার মা রহিমা বেগমের কূটচাল। মামলার আসামিরা গত বৃহস্পতিবার রাতে তাকে নিয়ে হাজির হন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায়। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুল মহসীনের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রুবেল। এতে তিনি স্বেচ্ছায় বাড়ি ত্যাগ থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত সব ঘটনা তুলে ধরেন।

এদিকে রুবেল ফিরে এলে বৃহস্পতিবার সকালে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান রহিমা বেগম।

এর আগে গত বছরের ২৪ আগস্ট নারায়ণগঞ্জে কথিত গুম ও খুনের শিকার এক কিশোরী এক মাস ২০ দিন পর বাড়ি ফিরে আসে। ৫ নভেম্বর মামুন নামে এক যুবকও ছয় বছর পর ফিরে এলে সৃষ্টি হয় চাঞ্চল্য। প্রতিটি ঘটনাতেই অপহরণ ও গুমের মামলা করা হয়েছিল। আসামিরা জেলও খেটেছেন।

বুধবার রাতে ফিরে আসা রুবেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তার বাবার নাম জানু মিয়া। তিনি মারা যান রুবেল ছোট থাকতেই। মা রহিমা বেগম ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে তাদের তিন ভাইয়ের ভরণপোষণ করতেন। রুবেল ছিলেন সবার ছোট। সকালে মা কাজে বেরিয়ে যেতেন, ফিরতেন বিকেলে। মা বাড়ি ফিরলে রুবেল খাবারের জন্য বায়না ধরতেন। তখন ছেলেকে মারধর করতেন রহিমা। মায়ের মারধর আর ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে একদিন বাড়ি ছাড়েন রুবেল।

বৃহস্পতিবার রাতে রুবেল সদর মডেল থানায় সাংবাদিকদের জানান, বাড়ি থেকে বেরিয়ে তিনি লঞ্চে করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ শহরে আসেন। এরপর লঞ্চ টার্মিনালের পাশে থাকা রেলস্টেশন থেকে ট্রেনে ঢাকার কমলাপুর যান। কমলাপুরে বেশ কয়েক বছর ভিক্ষা করেন। আরেকটু বড় হলে এক ব্যক্তির সহায়তায় রামপুরায় একটি খাবার দোকানে কাজ নেন। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর তিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখেন। বর্তমানে ঢাকার মগবাজারের মধুবাগের একটি বাসায় স্ত্রী ও এক সন্তান নিয়ে ভাড়া থাকেন। মগবাজারে তিনি রংমিস্ত্রি আল আমিন নামেই পরিচিত। রুবেল আরও জানান, বাড়ি ছাড়ার ১০ বছর পর তার বয়স যখন ১৭ তখন মায়ের সঙ্গে ঢাকায় তার যোগাযোগ হয়। গত ছয় বছর ধরে তিনি নিজ এলাকায় ফিরতে চাইলেও মায়ের কারণে পারেননি। মা তাকে ভয় দেখাতেন, তিনি এলাকায় ফিরলে তাকে হত্যা করা হবে।

রুবেল জানান, রহিমা তাকে মামলার কথা জানিয়েছিলেন। রুবেল তখন মিথ্যা মামলার প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন রহিমা ছেলেকে বলেন, 'তুই এভাবে বাড়ি ফিরলে আমার ও তোর উভয়ের সমস্যা হবে। আমি তোকে কোর্টে নিয়ে যাব। তুই বলবি তোকে অপহরণ করে আটকে রাখা হয়েছিল।' সেই সঙ্গে অপহরণ মামলার আসামিদের নাম জানিয়ে তাদের নাম রুবেলকে মুখস্ত করতে বলেন রহিমা। কিন্তু রুবেল এতে রাজি না হওয়ায় তার বাড়ি ফেরা হয়নি।

রুবেলের বড় ভাই আবদুর রহমান জানান, রুবেল বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর ২০০৭ সালের ২৩ জানুয়ারি তার মা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ফেব্রুয়ারিতে তার মা এলাকার দুই মুক্তিযোদ্ধাসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ আদালতে রুবেলকে অপহরণ ও গুমের অভিযোগে একটি মামলা করেন। পরে মামলাটি সদর থানা তদন্ত করে। ওই মামলায় ছয়-সাতজন জেলও খেটেছেন।

এদিকে রহিমা বেগমের মামলার ১৯ আসামি ২০০৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর হযরানিমূলক মামলা থেকে রেহাই পেতে আইজিপি বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেন।

মামলার আসামি মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম বলেন, জমিসংক্রান্ত বিষয়ে একটি বিচার-সালিশ করায় রহিমা বেগম আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছিল। ওই সময় আমরা এর প্রতিকার পাইনি। অনেক হয়রানির শিকার হয়েছি। রুবেল ফিরে আসায় প্রমাণ হলো আমরা অপহরণ ও গুমে জড়িত নই।

সদর মডেল থানার ওসি শাহজামান বলেন, শুক্রবার বিকেলে রুবেল আদালতে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন।

মন্তব্য করুন