চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের নেপথ্যে বহিরাগত ইন্ধন, শ্রমিকদের সময়মতো বেতন না দেওয়া, অস্বাস্থ্যকর আবাসন ব্যবস্থাসহ বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছে পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটি। শ্রমিক বিক্ষোভের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করা হয়েছে। ওই ঘটনায় পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব চিত্র উঠে এসেছে। গত ১৭ এপ্রিল সংঘর্ষে সাত শ্রমিক নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন।

বুধবার চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেনের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেন খান। বিষয়টি প্রকাশ পায় শনিবার। বাঁশখালীর গণ্ডামারায় এসএস পাওয়ার-১ নামের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যৌথভাবে নির্মাণ করছে এস আলম গ্রুপ, চীনের প্রতিষ্ঠান সেফকো থ্রি ইলেকট্রিক পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন ও এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন বলেন, 'তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে যে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, সংঘর্ষের নেপথ্যে বাঁশখালী উপজেলার গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের আমিন উল্লাহর ছেলে আব্দুর রশিদ ও এমদাদ মিয়ার ছেলে নুরুল আলমের ইন্ধন পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তারা বিভিন্ন দাবি নিয়ে ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের মারমুখী করে তুলেছিলেন। এই দু'জনের নেতৃত্বে অন্তত ২৫ জন বহিরাগত শ্রমিককে উত্তেজিত করে তুলেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ ছাড়া প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বেতন পরিশোধের দাবি জানিয়েছিল শ্রমিকরা। বেতন পেতে কোনো কোনো মাসে ১৮ তারিখ পর্যন্ত শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এর জন্য দায়ী শ্রমিক সরবরাহকারী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। রমজানকে কেন্দ্র করে কিছু সমস্যাও শ্রমিকদের বিক্ষোভের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শ্রমিকদের অস্বাস্থ্যকর আবাসন, সুপেয় পানি সংকট, অপরিষ্কার টয়লেট ও খাবার সমস্যা ছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে শ্রমিকদের এ বিক্ষোভ পরিকল্পিত মনে হয়নি তদন্ত কমিটির। তাৎক্ষণিক শ্রমিকদের উত্তেজিত করে তোলা হয়েছে।

কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেন খান বলেন, চীনা নাগরিক ও বাংলাদেশিদের মধ্যে ভাষাগত জটিলতা থাকায় কিছু সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে এ জন্য কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলি চালানোর যৌক্তিকতা ছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'শুরুতে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা করেছে। এক পর্যায়ে রাবার বুলেট ছুড়ে সরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়েছে। পরে ব্যর্থ হয়ে চীনা নাগরিকদের জানমাল ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় গুলি চালিয়েছে পুলিশ।'

ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে তদন্ত কমিটি। এর মধ্যে রয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ; শ্রমিকদের সময়মতো বেতন দেওয়া; শ্রমিকদের কল্যাণে প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা; পুলিশের পাশাপাশি পর্যাপ্ত নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মী রাখা; চীনা নাগরিক ও বাংলাদেশিদের মধ্যে ভাষা জটিলতা দূর করা; মালিক-শ্রমিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা।

গত ১৭ এপ্রিল বাঁশখালীতে বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হয়েছেন সাতজন। ১৩ জন গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক। ওই ঘটনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করেছে। তাতে বহিরাগত ২২ জনের নাম উল্লেখসহ সাড়ে তিন হাজার শ্রমিককে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার দিনে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেন খানকে প্রধান, চট্টগ্রাম রেঞ্জের এসপি নেছার উদ্দিন আহমেদ ও জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কবির হোসেনকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি করে পুলিশ। এ ছাড়া অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনী আক্তারকে প্রধান করে পৃথক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক। তারাও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।