ফসল চাষে রাসায়নিক সার ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। দূষিত হচ্ছে মাটি, পানি ও বায়ু। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও প্রকৃতির উপকারী পোকামাকড়। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও জীববৈচিত্র্য। এ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দেশে প্রথমবারের মতো পরিবেশসম্মত বিষমুক্ত সবজি চাষ হচ্ছে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপির নিজ গ্রাম টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্দি গ্রামে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) প্রকল্পের আওতায় সারাদেশের মডেল প্রকল্প হিসেবে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ করছে। এ প্রকল্পের আওতায় এ মডেল ইউনিয়নে রবি ও খরিপ মৌসুমে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষে রয়েছে ২০টি দল। প্রতিটি দলে পাঁচজন নারীসহ ২৫ জন করে রয়েছেন সদস্য। ২০টি দলে মোট ৫০০ কৃষক নিরাপদ সবজি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন।

সরেজমিন মুশুদ্দি ইউনিয়নে গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে বিষমুক্ত সবজি চাষে নানা সফলতার কথা জানা যায়। এক সময় তারা ধান ও সবজি চাষে রাসায়নিক সার ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ করতেন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগে জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতির কথা মাথায় নেননি। সম্প্রতি রবি মৌসুমের আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারাদেশে ১০টি মডেল ইউনিয়নে আইপিএম প্রকল্পের আওতায় টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্দি ইউনিয়নকে গ্রহণ করে। জৈব কৃষি ও জৈবিক বালাই দমন ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আওতায় ফেরোমন ফাঁদ স্টিকিটাপ বা হলুদ আঠালো ফাঁদ পরিবেশবান্ধব। জৈব বালাইনাশক পদ্ধতিতে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্পে সুযোগ পেয়ে ৫০০ নারী-পুরুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাদের বিষমুক্ত সবজি ইতোমধ্যে উপজেলা-জেলা ছাড়িয়ে রাজধানী ঢাকায়ও সুনাম কুড়াচ্ছে। প্রশিক্ষিত কৃষকরা রবি মৌসুমে করলা, চালকুমড়া, মিষ্টি কুমড়া ও খরিপ মৌসুমে পটোল, ধুন্দল, লাউ চাষ করছেন। রাসায়নিক সার ও বিষমুক্ত সবজি চাষে সফলতা পেয়ে কৃষকদের মুখে হাসি দেখা দিয়েছে। মুশুদ্দি উত্তরপাড়া গ্রামের কৃষক আবদুর রাজ্জাক জানান, তিনি জৈবিক উপায়ে ৩৫ শতাংশে করলা, ২০ শতাংশে চিচিঙ্গা, ২০ শতাংশে পটোল, ২০ শতাংশে চালকুমড়া চাষ করেছেন। ক্ষতিকর পোকামাকড় দমনে এবং রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈবিক উপায় অবলম্বন করেছেন। আগে সবজি চাষে কীটনাশক ও বিষ ব্যবহার করা হতো। কৃষি বিভাগ থেকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিষমুক্ত সবজি চাষ করছেন। এতে তার খরচ অনেকটা কমে এসেছে। মুশুদ্দি কামারপাড়া গ্রামের সোহরাব আলী জানালেন, ২০ শতাংশ জমিতে করলা ও ১০ শতাংশে পটোল চাষ করেছেন। তিনি আগে এ চাষ পদ্ধতি জানতেন না। এবার তিনি বিষের পরিবর্তে সেক্স ফেরোমন ও আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করছেন। সারের পরিবর্তে জৈব ও কেঁচো সার ব্যবহার করে ফলন ও দাম ভালো পেয়েছেন।

খন্দকার পাড়ার সোলায়মান ও মুশুদ্দি উত্তরপাড়ার মুহাম্মদ আলী তাদের উৎপাদিত পরিবেশসম্মত সবজি প্যাকিং করে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করার দাবি জানিয়ে বলেন, ধনবাড়ী এলাকার বিষমুক্ত সবজি চাষিদের জন্য হিমাগার স্থাপন করলে তারা মানসম্মত সবজি সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে তারা সবজির ন্যায্যমূল্য পাবেন।

শুধু আবদুর রাজ্জাক, সোহরাব আলী, মিজানুর, আকাব্বর, সোলায়মান, মুহাম্মদ আলী, মুকুল ও আয়নাল হকই নন- এ রকম ৫০০ কৃষক-কৃষাণি একই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করছেন। মুশুদ্দি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, পটোল, চিচিঙ্গা, করলা, কুমড়া ক্ষেতে প্লাস্টিকের বোতল ও হলুদ রঙের কার্ড উপরে দুলছে। দূর থেকে দেখে মনে হয় রঙিন কাগজ উড়ছে। সারি সারি সবজি বাগান। কৃষকরা আরও জানালেন, এ বছর তাদের সবজি পোকায় নষ্ট করতে পারেনি, ফলনও ভালো। তবে রয়েছে ন্যায্যমূয়ল্য না পাওয়ার কথা।

এ ব্যাপারে ধনবাড়ী উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ আহম্মেদ জানান, জৈবিক উপায়ে বিষমুক্ত সবজি চাষে এ প্রকল্পের কৃষকদের হাতে-কলমে শেখানো হয়েছে। কেঁচো সার তৈরিসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিনামূল্যে বীজ, মাচা, মাচার খুঁটি ও নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে। মাঠে গিয়ে তাদের পরামর্শ দেওয়ার মাধ্যমে নতুন কৌশলে সবজি চাষ করানো হয়েছে।

ধনবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদনে সারাদেশের ১০টি ইউনিয়নে মডেল হিসেবে কাজ চলছে। তার মধ্যে ধনবাড়ীর মুশুদ্দি ইউনিয়ন একটি। আমরা নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য থেকে পিছিয়ে আছি। এ চাহিদা পূরণের জন্য এটি একটি উত্তম পন্থা। বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো বিশেষ প্রয়োজন। ধনবাড়ী উপজেলার মুশুদ্দি ইউনিয়নে ১০০ একরে বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি মডেল হিসেবে আবাদ করা হয়েছে, যাতে এটি দেখে অন্যরাও উৎসাহ পায়।

এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক এমপি বলেন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মুশুদ্দি ইউনিয়নকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে এ বছর ১০০ একরে নিরাপদ বিষমুক্ত সবজি চাষ করা হয়েছে। এ প্রকল্প আমি পরিদর্শন করেছি। আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। স্বাস্থ্যের জন্য বিষমুক্ত নিরাপদ সবজির আবাদ শুধু মুশুদ্দি নয়, সারাদেশে এর বিস্তার ঘটানোর জন্য বর্তমান সরকার কাজ করছে। কৃষকদের দাবি-দাওয়া সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, তাদের দাবি-দাওয়াগুলো আমি অবগত আছি। পর্যায়ক্রমে এ দাবি পূরণ করা হবে।

মন্তব্য করুন