ঢাকা শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

নাবিলের নৌকা ডোবাতে শাহীনের দুই অনুসারী মাঠে

যশোর-৩ (সদর) আসন

নাবিলের নৌকা ডোবাতে শাহীনের দুই অনুসারী মাঠে

কাজী নাবিল আহমেদ, শাহীন চাকলাদার

তৌহিদুর রহমান, যশোর

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০১:৪৪ | আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ | ০৭:২৭

যশোরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে শাহীন-নাবিলের বিরোধ এক দশকের। মূলত যশোর-৩ (সদর) আসনে দলীয় মনোনয়ন ঘিরেই তাদের দু’জনের এই দ্বন্দ্ব। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন টানা দু’বারের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ। আর শাহীন চাকলাদার পেয়েছেন কেশবপুর আসন থেকে। তবে সদরের ভোটযুদ্ধে শাহীনের দৃশ্যমান লড়াই না থাকলেও মাঠে রয়েছেন তাঁর হেভিওয়েট দুই অনুসারী। এবার নাবিলের নৌকা ডোবাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলাম মিলন ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথ। তারা দু’জনেই শাহীন চাকলাদারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

নাবিল সমর্থকদের মতে, মিলন ও মোহিতকে মাঠে নামিয়েছেন শাহীন চাকলাদার। আর শাহীন সমর্থকদের দাবি, নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক করতে দলের হাইকমান্ড স্বতন্ত্র দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আবার দলের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তাতেও আপত্তি নেই, নেওয়া হবে না কোনো ব্যবস্থাও। ফলে শাহীন চাকলাদার এই সুযোগটা নিচ্ছেন।

যদিও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মোড়কে এসব প্রার্থী হচ্ছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বলে নেতাকর্মীর ভাষ্য জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এ কে এম খয়রাত হোসেন বলেন, দলের এক নেতার ইঙ্গিতে দলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত হয়নি মিলন আর মোহিত নাথের। আগে দলের আদর্শ বড়; তারপরে ‘ভাই লীগ’। দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নৌকার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে; তাহলে নৌকাকে বিজয়ী করবে কে?

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার ও কাজী নাবিলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব শুরু হয় ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নকে ঘিরে। সদর আসনে দু’জনেই দলীয় মনোনয়ন চাইলেও পেয়েছিলেন নাবিল। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন শাহীনের সমর্থকরা। এরপর আবারও ২০১৮ সালে মনোনয়ন চেয়ে বঞ্চিত হন শাহীন। দল আবারও মনোনয়ন দেয় নাবিলকে। এতে শাহীন-নাবিলের দ্বন্দ্ব প্রকট হয়। ২০২০ সালে কেশবপুরের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হলে উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছিলেন শাহীন চাকলাদার। তিনি কেশবপুরের এমপি হলে সদরে তাঁর একক আধিপত্যে ভাটা পড়তে থাকে। ফলে তাঁর দীর্ঘদিনের শীর্ষ অনুসারীরা ভেড়েন নাবিলের ডেরায়। রাজনীতিতে শাহীনের অস্তিত্বের স্বার্থে তিনি আবারও সদরে ফিরতে থাকেন। ফলে জেলার এই দুই শীর্ষ নেতার দ্বন্দ্ব এখনও চলমান।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন ও সদর উপজেলা সভাপতি মোহিত কুমার নাথ এর আগে নাবিল আহমেদের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতেন। তবে তাদের সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় বর্তমানে তারা দু’জন শাহীন চাকলাদারের সঙ্গে রাজনীতি করছেন। দলীয় কার্যক্রমে একসঙ্গে অংশ নিচ্ছেন। এসব কার্যক্রমে কাজী নাবিলকে দেখা যায় না। তিনি আলাদাভাবে দলীয় কার্যক্রম করেন।

শাহীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, সদর থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয় পুরো জেলার রাজনীতি। সদর উপজেলায় শাহীনের বেশ প্রভাব রয়েছে, রয়েছে অনেক অনুসারী। তবে কেশবপুরের সংসদ সদস্য হওয়ার পর সদরের রাজনীতিতে কিছুটা আলগা হয়ে যান। পাশাপাশি কাজী নাবিলের বলয়ে বিতর্কিত ও সন্ত্রাসীরা ভিড় করায় তিনি এখন বেশ ইমেজ ঘাটতিতে। আর দলের স্বতন্ত্রের তকমার সুযোগে নাবিলের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে গেছেন শাহীনের দুই অনুসারী। তারা দু’জনেই মাঠ গুছিয়ে ফেলেছেন।

ওই নেতা জানান, দল স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশনা দিলে দু’জনের মধ্যে একজন প্রার্থী থাকবেন। এ সময় সদরে শাহীনের সক্রিয় নেতাকর্মী তাঁর পক্ষেই কাজ করবেন।

এ বিষয়ে যশোর-৩ আসনের প্রার্থী ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এমপি কাজী নাবিলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর অনুসারী জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মেহেদী হাসান মিন্টু বলেন, যশোরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্য গ্রুপিং এবং মেরূকরণ আছে। সেই মেরূকরণের প্রভাব পড়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, তৃণমূল নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থীকেই বেছে নেবেন। কেননা ব্যক্তির চেয়ে দল আগে।

স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহিত কুমার নাথ বলেন, সদরের রাজনীতিতে আমি দীর্ঘদিন। দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলাম, দল দেয়নি। তাই জনগণের চাপে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। তিনি বলেন, একসময় নাবিলের সঙ্গেই রাজনীতি করতাম। তাঁর তৃণমূলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। টানা দু’বারের এমপি নির্বাচিত হয়েও যে পরিমাণে উন্নয়ন হওয়ার কথা, সেটা হয়নি। এ কারণে নাবিলকে চায় না জনগণ।

যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, বর্তমান সংসদ সদস্য নাবিলের সঙ্গে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। জনগণ তাঁকে ভোট দিতে চায় না। সেই কারণে জনগণের চাপে আমি প্রার্থী হয়েছি। আমি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করব।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সংসদ সদস্য ও যশোর-৬-এর প্রার্থী শাহীন চাকলাদার সমকালকে বলেন, যারা স্বতন্ত্র দাঁড়িয়েছেন, তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছায়। আমি কাউকে নির্দেশনা দিইনি। যারা এসব প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, তারা দলের কেউ না। দলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য। আমরা জেলা আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থেকে ৬টি আসনেই নৌকা বিজয়ী করে শেখ হাসিনাকে উপহার দেব।

আরও পড়ুন

×