রাজধানীর মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশাল জায়গাজুড়ে নানা নামে গড়ে ওঠা বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে- এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়; আমরা জানি। সোমবার ভোরে সেখানকার 'সাততলা' বস্তিতে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেও অগ্নিনির্বাপক সংস্থার পক্ষ থেকে দুটি আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে- বিদ্যুৎ বা গ্যাসের অবৈধ সংযোগ থেকেই আগুনের সূত্রপাত। মাত্র ছয় মাসের মাথায় দ্বিতীয়বার নয়; তারও আগে ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ সালে সাততলা বস্তি এলাকায় আগুন লেগেছিল। সোমবারের অগ্নিকাণ্ডের কারণ যা-ই হোক, অতীতে দেখা গেছে, একেকটি বস্তিতে আগুন লাগে আর উড়তে থাকা ধোঁয়ার সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় নানান গুজব। প্রকাশ্যে যদিও এবারের মতোই গ্যাস বা বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ, এমনকি বৈধ সংযোগের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, রান্নার আগুন- প্রভৃতি উৎসকে দায়ী করা হয়; অপ্রকাশ্যে ধূমায়িত হয়ে ওঠে সেই আগুনে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের আলু পুড়িয়ে খাওয়ার গল্প। আমরা জানি, গোপাল ভাঁড়ের যুগে একজনের আলুর গুদাম পুড়ে যাওয়ার পর অনেকে নুন মাখিয়ে আলু খাওয়ায় মেতেছিল। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে আগুন লাগার পরও প্রতীকী অর্থে একই চিত্র দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রেই পরে দেখা যায়, সেসব আগুন আসলে 'আধিপত্য' বিস্তারের। কারণ এসব বস্তির বেশিরভাগ যদিও সরকারি ভূমি বা খাসজমিতে; সেখানে 'দখল' থাকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবশালীদের। বস্তির খুপরি ঘরগুলোতে বাস করা নিম্ন আয়ের রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহকর্মী বা পোশাক কর্মীরা হয়ে ওঠেন 'সোনার ডিমপাড়া হাঁস'। বস্তির দীর্ণ ঝুপড়িগুলো 'ভাড়া দিয়ে' কিছু ব্যক্তি আলিশান বাড়ি, ঝাঁ চকচকে গাড়ির মালিক হয়। এসব 'সাম্রাজ্য' কেবল সরকারি জায়গা বেসরকারি প্রভাবশালীর ভাড়া দেওয়ার মধ্যেই সীমিত নেই। 'বৈধ' বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সংযোগ দিয়েও 'অবৈধভাবে' নিয়মিত তোলা হয় লাখ লাখ টাকার চাঁদা। সরকার বদল হলে আধিপত্যের মুখগুলো বদল হয়; কিন্তু দরিদ্র বস্তিবাসীর ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। সাততলা বস্তিতেও কমবেশি একই চিত্র। এখন দেখতে হবে, অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে অতীতের মতো আধিপত্য বিস্তারের অঘটন রয়েছে কিনা। সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, কারণ অনুসন্ধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা দেখতে চাইব, এই কমিটি আন্তরিকভাবে কাজ করেছে। কেবল অনুসন্ধান নয়; অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও চিত্রও প্রকাশ করা হয়েছে। অতীতে এ ধরনের তদন্ত কমিটি অনেকবার গঠিত হয়েছে। কিন্তু সেসব তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। সাততলা বস্তির ক্ষেত্রে এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না। আর বস্তিতে বারবার আগুন লাগারও অবসান হতে হবে। নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে 'উচ্চবিত্ত' একটি গোষ্ঠীর এই মৌরসি পাট্টা আর চলতে দেওয়া যায় না। মনে রাখতে হবে, মেগাসিটিগুলোতে ধনী ও দরিদ্রের সহাবস্থান এক অনিবার্য বাস্তবতা। নগরের ধনিক শ্রেণির উচ্চস্তরের জীবনযাত্রা বজায় রাখতে নিম্নস্তরের কাজে খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষই একমাত্র ভরসা। এ ছাড়া এই শহরের গার্মেন্ট শিল্পেও কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক। বলতে হবে 'রিকশার শহর' ঢাকার রিকশাওয়ালাদের কথাও। তাদের বড় অংশ আসলে গ্রামাঞ্চল থেকে কর্মখোঁজে ঢাকায় আসা অদক্ষ, অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। এই জনগোষ্ঠী কোথায় থাকবে? প্রশ্নটি মানবাধিকারেরও। আগুনে কেবল বস্তিবাসীর মাথা গোঁজার ঠাঁই ও সম্পদই ভস্মীভূত হয় না; অনেক সময় জীবন্ত পোড়ে স্বজন ও সন্তান। অবৈধ ও অমানবিক এই ব্যবস্থা আর চলতে দেওয়া যায় না। আমরা মনে করি, বস্তির জায়গাতেই বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ ঝুপড়ির বদলে বহুতল ভবন নির্মাণ করে নিম্নবিত্তদের বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। বস্তিতে যে 'উচ্চমূল্যে' তারা ঘর, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পায়; সরকারিভাবে নির্মিত গৃহ নিঃসন্দেহে তার চেয়ে সাশ্রয়ী হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির ক্ষেত্রে চুরি ও অপচয়ও আসবে নিয়ন্ত্রণে। আমরা মনে করি, ঢাকার মতো মেগাসিটির দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে বিপুল অবদান রাখা শ্রমজীবী নিম্নবিত্ত মানুষেরও অধিকার রয়েছে সুষ্ঠুভাবে জীবন ও জীবিকা পরিচালনার। বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের 'দুর্ঘটনা' সেই অধিকারের সরাসরি ব্যত্যয়।

বিষয় : বস্তির আগুন

মন্তব্য করুন