বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর তাদের শেষ শ্রদ্ধা জানাতে 'গার্ড অব অনার' বা রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে নারী কর্মকর্তা না রাখার সুপারিশ করেছে খোদ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এই সুপারিশ কেবল অবিশ্বাস্য নয়, অবিমৃষ্যকারীও বটে। যে দেশে টানা তিন দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করছেন নারী; সে দেশে এ ধরনের প্রস্তাব কেবল বিস্ময়কর নয়, বেদনাদায়কও। যে সংসদে দুই মেয়াদ ধরে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন একজন নারী, সেই সংসদেরই একটি সংসদীয় কমিটির এ ধরনের সুপারিশ 'দুঃসাহস' ছাড়া আর কী হতে পারে! এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে জীবন বাজি রেখেছে। এক অর্থে বরং নারীর সংগ্রাম ও ত্যাগ ছিল পুরুষের চেয়ে বেশি। একাত্তরে প্রাণ ও রক্ত দেওয়ার পাশাপাশি দুই লাখ মা-বোনকে হারাতে হয়েছে সল্ফ্ভ্রম। শরণার্থী জীবনে কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও স্বজনহারা নারীদের মোকাবিলা করতে হয়েছে পুরুষের চেয়ে বেশি প্রতিকূলতা। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটি এই সুপারিশের মধ্য দিয়ে স্পষ্টতই নারীর সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও মর্যাদার অবমাননা করেছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

একই সঙ্গে এও মনে করি, এই সুপারিশ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হওয়াই উচিত ছিল না। সংসদীয় কমিটিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ছাড়াও সদস্যদের সবাই সুপরিচিত মুক্তিযোদ্ধা। তাদের উপস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এই সুপারিশ কীভাবে গৃহীত হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়। মনে রাখা জরুরি, আলোচ্য সুপারিশ সংবিধানবিরোধীও। মহান সংবিধানে দেশের নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সেখানে সংবিধানের আঁতুড়ঘর বিবেচিত জাতীয় সংসদ থেকেই এমন প্রস্তাব কীভাবে আসতে পারে! বস্তুত এর মধ্য দিয়ে সংশ্নিষ্ট সংসদ সদস্যদের শপথ ভঙ্গ হয়েছে কিনা- সংবিধান বিশেষজ্ঞরা খতিয়ে দেখতে পারেন। আমরা জানি, বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তাদের মূলধারায় সম্পৃক্তকরণের নীতি গ্রহণ করেছে। টানা তিন মেয়াদের ধারাবাহিক পদক্ষেপ ও উদ্যোগের ফলে এখন দেশে মাঠ পর্যায়ে আটজন জেলা প্রশাসক ও শতাধিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন নারী। কেবল প্রশাসনে নয়; রাজনীতি, বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ক্রীড়াক্ষেত্র, পেশাজীবী হিসেবেও নারীরা একের পর এক অর্গল ভেঙে এগিয়ে চলেছে। সংসদীয় কমিটির এ সুপারিশ তাদের জন্যও হতাশাজনক। এই আশঙ্কাও অমূলক হতে পারে না যে, এমন সুপারিশকারী সংসদ সদস্যরা সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও উদাসীন অথবা বেপরোয়া।

এর মধ্য দিয়ে তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, নারীবিদ্বেষী ও পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। এ দেশে ধর্মব্যবসায়ী রাজনৈতিক পক্ষগুলো যেভাবে রাষ্ট্র ও সরকারের বিভিন্ন পদে নারীর দায়িত্ব পালনে বিরোধিতা করে থাকে; সংসদীয় কমিটির সুপারিশে যেন তারই কালো ছায়া স্পষ্ট। সংসদীয় কমিটি এমন সুপারিশের পেছনে জানাজায় নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ক যে যুক্তি দিয়েছে, তা নেহাত খোঁড়া। জানাজা ও রাষ্ট্রীয় সম্মান সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুপারিশটি যেভাবে 'খতিয়ে দেখা'র কথা বলা হয়েছে, তাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সংবিধানবিরোধী যে কোনো প্রস্তাবই পত্রপাঠ বাতিল করার দৃঢ়তা থাকতে হবে মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।

আমরা দেখেছি, ইতোমধ্যে তাদের এই সুপারিশ দেশের সচেতন ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে বিক্ষুব্ধ জনমত। মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠন থেকে এসেছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ। আমরা এসব বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমর্থন করি। আমরা দেখতে চাই, অবিলম্বে এই সুপারিশ সংশ্নিষ্ট সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকেই প্রত্যাহার এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়েছে। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অবদান ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অবিমৃষ্যকারিতার অবারিত ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে না।