বইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি মানুষ দু'দণ্ড সময় কাটাবে কিংবা বুকভরে নিঃশ্বাস নেবে- এমন উন্মুক্ত পরিসর খুব একটা অবশিষ্ট নেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। ব্রিটিশ আমলের চুন-সুরকির সিআরবি ভবনকে ঘিরে শতবর্ষী গাছগাছালি, পিচঢালা আঁকাবাঁকা রাস্তা, ছোট-বড় পাহাড়-টিলা আর নজরকাড়া বাংলোগুলো ঘিরে মন জুড়ানো এক প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে সিআরবিতে। নগরবাসী স্থানটিকে চট্টগ্রামের 'ফুসফুস' বলে থাকেন। কিন্তু এখানে বড়সড় একটি হাসপাতাল নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করে সেই 'ফুসফুস' ধ্বংসের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বাধা ও মতামত উপেক্ষা করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে সিআরবিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ নির্মাণের সব আয়োজন প্রায় চূড়ান্ত। ইতোমধ্যে ইউনাইটেড হাসপাতাল পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও করেছে রেলওয়ে। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ রেলের সঙ্গে চুক্তি করার পর এখন হাসপাতাল নির্মাণের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অপরিণামদর্শী এমন উদ্যোগে হতাশা ফুটে উঠেছে প্রকৃতিপ্রেমী কবি রিতু পারভীর বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, সিআরবিতে এখনও টিকে আছে অনেক শতবর্ষী গাছগাছালি, অনেকগুলো পাহাড়। আছে ব্রিটিশ আমলে তৈরি স্থাপনা, যার রয়েছে স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক মূল্য। স্বর্গসম এ জায়গাটিতে হাসপাতাল হলে এখান থেকে বিতাড়িত হবে প্রকৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণ, কাটা পড়বে গাছগাছালি, তৈরি হবে মেডিকেল বর্জ্য, গড়ে উঠবে দোকানপাট। এভাবে একবার বাণিজ্যিক আগ্রাসন শুরু হলে সেটা আর আটকানো যাবে না।
এদিকে চুক্তি করলেও সিআরবিতে হাসপাতাল চান না খোদ রেলওয়ের শ্রমিক-কর্মচারীরা। এরই মধ্যে তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, তারা হাসপাতালের বিপক্ষে নন। তবে এই ধরনের হাসপাতাল করার মতো চট্টগ্রাম নগরীতে রেলওয়ের অনেক জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কিছু জমি আছে প্রভাবশালীরা দখল করে আছেন। সেগুলো উদ্ধার করে হাসপাতাল করা যায়। সিআরবিকে কেন বেছে নেওয়া হলো তা তাদের বোধগম্য নয়।
চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যমান হাসপাতালের পাশে ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ, ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং হাসপাতালটি আধুনিকায়ন করে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হবে। রেলওয়ে বলছে, বর্তমানে চট্টগ্রামে রেলের যে হাসপাতালটি আছে, সেটিসহ আশপাশের জায়গা মিলে ছয় একর জমি দেওয়া হয়েছে ইউনাইটেড গ্রুপকে। তাদের সঙ্গে ৫০ বছরের চুক্তি করেছে রেলওয়ে। চুক্তি অনুযায়ী, ইউনাইটেড গ্রুপ স্থাপনার নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ অর্থায়ন ও পরিচালনা করবে। আর্থিক চুক্তিমতে পিপিপি ডেভেলপমেন্ট ফি হিসেবে রেলওয়েকে এককালীন দেওয়া হয়েছে পাঁচ কোটি টাকা। আরও সাড়ে তিন কোটি টাকা দেওয়া হবে ভাগেভাগে। চুক্তি স্বাক্ষরের তিন বছর পর প্রথম বার্ষিক ফি হিসেবে ৭৫ লাখ টাকা, চতুর্থ বছরে ৭৫ লাখ টাকা, পঞ্চম ও ষষ্ঠ বছরে দেড় কোটি টাকা করে রেলওয়েকে দেবে ইউনাইটেড গ্রুপ। পরবর্তী সময়ে চুক্তির মেয়াদকাল পর্যন্ত অর্থাৎ ৫০ বছর ধরে তিন বছর পর পর ১০ শতাংশ হারে এই ফি বাড়বে।
চট্টগ্রামে বর্তমানে একটি সরকারি ও চারটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে। এর বাইরে বেশ কয়েকটি বড় বেসরকারি হাসপাতাল আছে। আরও আছে ছোট-বড় বেশকিছু ক্লিনিক। সম্প্রতি নতুন করে গড়ে উঠেছে একাধিক বড় হাসপাতালও। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ইউনাইটেড হাসপাতাল। এদিকে হাসপাতালের নকশার অন্তর্গত জায়গায় থাকা রেল কর্মচারীদের বাসা থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ প্রসঙ্গে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন সমকালকে বলেন, সিআরবিতে শুধু হাসপাতালই নয়, কোনো ধরনের স্থাপনাই হওয়া উচিত হবে না। মনে রাখতে হবে, এই স্থানটি চট্টগ্রামের ফুসফুস। বুকভরে বাতাস নিতে এটাকে রক্ষা করতে হবে। চট্টগ্রামে ঢাকার মতো রমনা পার্ক নেই, বোটানিক্যাল গার্ডেন নেই। গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত নয়নাভিরাম এই উন্মুক্ত পরিসরটিই যদি না থাকে, মানুষ যাবে কোথায়! চট্টগ্রামে অনেক খালি জায়গা আছে, যেখানে হাসপাতাল করা যায়। যে কোনো মূল্যে সিআরবির প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করতে হবে।
সিআরবিকে চট্টগ্রামের কার্বন শোষণের প্রাকৃতিক কারখানা আখ্যায়িত করে বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও কর্ণফুলী গবেষক ড. ইদ্রিস আলী সমকালকে বলেন, হাসপাতাল করার মতো চট্টগ্রামে অনেক জায়গা থাকার পরও সিআরবিকে কেন বেছে নেওয়া হলো তা আমার বোধগম্য নয়। এখানে শতবর্ষী গর্জন ও রেইনট্রিসহ অনেক গাছ আছে। পাখির কোলাহল, বসার জায়গা, হাঁটাহাঁটির পথ, এমনকি ইকোসিস্টেমের অঙ্গ-অংশও এখানে। প্রাণ-প্রকৃতিতে ভরা এমন গণসামাজিক জায়গায় কংক্রিটের ভারী স্থাপনা নির্মাণ খুবই দুঃখজনক। আর শহরের মাঝখানে কেন হাসপাতাল হবে? যারা এটা করছেন, তাদের সরে আসতে হবে। এর বিরুদ্ধে নগরবাসীকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরব হওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
চট্টগ্রাম শহরের বন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, যে গাছ, পাহাড়-টিলা কেটে হাসপাতাল করা হচ্ছে, সে রকম গাছগাছালি কি আমরা লাগাতে পারছি? সিআরবির প্রাকৃতিক পরিবেশ রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। এটি শতবছরে গড়ে উঠেছে। অথচ রাতারাতি এই পরিবেশ ধ্বংসের আয়োজন করা হয়েছে। সিআরবি একটি ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে চট্টগ্রামের বাইরে থেকেও লোকজন আসে। এসব বিবেচনায় এখানে হাসপাতাল করার সিদ্ধান্ত নিতান্তই অবিবেচক।
অবসরে সময় কাটাতে কিংবা ঘুরতে মানুষ সিআরবিতে আসেন। চলে নাটক-সিনেমার চিত্রধারণও। এসব বিবেচনায় ২০১২ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিআরবিকে সাজিয়ে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নিয়েছিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। রেলওয়ে সদর দপ্তর এবং এখানকার রেলওয়ে আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় যাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রেখেই প্রকল্পটি তৈরি করা হয়েছিল। সিআরবির পুরো এলাকাকে প্রকল্পের আওতায় না এনে লোক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত সাত রাস্তার মোড়কে ঘিরে ২৫ একর জমির ওপর প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনার মধ্যে ছিল সিআরবির অভ্যন্তরে ছোট খালটিকে বাড়িয়ে কৃত্রিম লেক তৈরি, ফোয়ারা, কৃত্রিম ঝরনা, পাহাড়ে ওঠার জন্য সিঁড়ি নির্মাণ, এক পাহাড়ের সঙ্গে অপর পাহাড়ের সংযোগ তৈরির জন্য ফুট ওভারব্রিজ, লেকের ওপর কাঠের পাটাতনে বসার জায়গা, হাঁটাচলার জন্য দুই কিলোমিটারেরও বেশি রাস্তার পাশে তাঁবুর আদলে বসার জায়গা সৃষ্টি করা। এ ছাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা খাদে অ্যাম্ম্ফিথিয়েটার নির্মাণ করে সেখানে একসঙ্গে চার হাজার মানুষ বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করার সুবিধা তৈরির কথা ছিল। ওয়াকওয়ে, রুফওয়ে, লেক, ঝরনা, ফুড কর্নারসহ আরও কিছু নাগরিক সুবিধা রাখারও পরিকল্পনা ছিল। এই উদ্যোগ আজও আলোর মুখ দেখেনি।
জানতে চাইলে হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক) আহসান জাবীর বলেন, 'চুক্তি অনুযায়ী হাসপাতালের নকশা তৈরি করে আমাদের কাছে জমা দিয়েছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। নকশাটি চউক থেকে অনুমোদন নেওয়া হবে। এরপর প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে। এ মাসেই মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেই কাজ শুরু হবে।'
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে পরিবেশের কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে এই বিষয়টি যাচাই করতে পরামর্শক নিয়োগ করেছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। রিপোর্ট পাওয়ার পর পরিবেশ রক্ষায় করণীয় নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া হাসপাতাল নির্মাণকালে যাতে শতবর্ষী গাছগুলো কাটা না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখা হবে।'
সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ বন্ধ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা শেখ লোকমান হোসেন, রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর সবুর, রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার ও কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মোখলেছুর রহমান, রেলওয়ে এমপ্লয়িজের সভাপতি কাজী আনোয়ারুল হক, রেলওয়ে কারিগর পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এসকে বারী, রেলওয়ে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক ও কর্মচারী দলের সাধারণ সম্পাদক এমআর মঞ্জু, রেলওয়ে জাতীয় শ্রমিক পার্টির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান পিন্টু, রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান এবং রেলওয়ে শ্রমিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম ফারুকী। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও রেলের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককেও চিঠি দিয়েছেন তারা। তারা বলছেন, চট্টগ্রাম শহরের অদূরে কুমিরায় রেলের একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল রয়েছে। পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ওই হাসপাতাল ও আশপাশে প্রায় ১০ একর জমি খালি পড়ে রয়েছে। সিআরবির পরিবর্তে ইউনাইটেড হাসপাতালটি যেন সেখানে নির্মাণ করা হয়।
এসব বিষয়ে জানতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষের কারও সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

বিষয় : গাছ কেটে হাসপাতাল

মন্তব্য করুন