অগ্নিনিরাপত্তায় ঘাটতি দেখে আগে থেকে সতর্ক করলেও টনক নড়েনি হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের। ভয়াবহ দুর্ঘটনার এক মাস আগে কারখানা পরিদর্শন করে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর তাদের সতর্ক করেছিল। পরিদর্শনের পর কারখানার অগ্নিসহ নানা নিরাপত্তা ঘাটতি সমাধানের নোটিশ দেয় অধিদপ্তর। অথচ এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি সজীব গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠান। যথাযথ ব্যবস্থা নিলে হয়তো এ ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের কারখানায় ভয়াবহ আগুন লাগে। ২০ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে গত শুক্রবার দুপুরের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি টিম। দুর্ঘটনায় এরই মধ্যে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কলকারখানা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাসেম ফুডসের কারখানা ভবনে নানা ত্রুটি ছিল। কর্মপরিবেশ শ্রমিকদের অনুকূলে ছিল না। বিষয়টি সতর্ক করা হলেও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এ কারণে গত ৩০ জুন শ্রম আদালতে মামলা করে কলকারখানা অধিদপ্তর।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান ও দায়ীদের খুঁজে বের করতে জেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর ও বিস্ম্ফোরক পরিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক সৌমেন বড়ূয়া সমকালকে বলেন, গত মাসে তারা এ কারখানা পরিদর্শন করেন। কারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথ ছিল না। করোনাকালে কারখানার মধ্যে সামাজিক দূরত্ব মেনে কাজ করার মতো পরিস্থিতি দেখা যায়নি। নানা বিষয়ের ত্রুটি তুলে ধরে তাদের সতর্ক করা হয়। এর পরও সংশোধন না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। দুর্ঘটনার আগেই গত ৩০ জুন শ্রম আদালতে মামলার আবেদন করেন তারা। কিন্তু লকডাউন থাকার কারণে মামলার দাপ্তরিক অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারেননি। তিনি বলেন, সতর্ক করার পরও এই ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। এখন এ বিষয়ে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ছয় সদস্যের ওই কমিটি আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিকে এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আবারও মামলা হতে পারে।

জানা গেছে, এ কারখানার ত্রুটির বিষয়ে সতর্ক করার পর অগ্নিনির্বাপক আমদানি করেছে হাসেম ফুডস। কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে স্থাপন করা হয়নি। কারখানা ভবনটি বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়নি। যথাযথ অবকাঠামো না থাকায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি আমদানির পরও কোনো মহড়া দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। ফলে অগ্নিদুর্ঘটনার সময় তা কোনো কাজে আসেনি। আগুন লাগার পর কর্মীদের ভবন থেকে দ্রুত বের হওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। নিরাপত্তার জন্য সিঁড়ি করা হয়নি। ভবনের মধ্যে গুদামে নানা কাঁচামাল ও পণ্য মজুদ করে রাখা হয়েছে। এসব দাহ্য পদার্থের কারণে আগুন আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তা ছাড়া একটি শিল্পকারখানা সরকারি ১২টি প্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে পরিচালনা করতে হয়। এ কোম্পানি কিছু প্রতিষ্ঠানের সনদ নিয়ে পরিচালনা করলেও সঠিকভাবে অনেক নির্দেশনা মানা হয়নি।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইর কেমিক্যাল ও শিল্পবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন সমকালকে বলেন, রাসায়নিকের কারণে বারবার দুর্ঘটনা ঘটার পরও সতর্ক হচ্ছে না প্রশাসন। এর আগে পুরান ঢাকায় কয়েক দফা অগ্নিকাণ্ড হয়েছে। হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজে পেট্রোসিনথেটিক কেমিক্যাল, রেজিন, পেট বোতল, পলি প্যাকেটসহ মালপত্র ছিল নির্ধারিত মাত্রার পাঁচ গুণ বেশি। এ কারণে ক্ষতি অনেক বেশি মাত্রায় হয়েছে। দুর্ঘটনা থেকে রেহাই পেতে দ্রুত বের হওয়ার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এমনি কারখানার মধ্য থেকে বিশেষ পাইপের মাধ্যমে পাশে পানির পুকুর বা বড় চৌবাচ্চার ব্যবস্থা থাকলে সবাই দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারত। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংস্থাকে নানা বৈঠকে কারখানায় এমন ব্যবস্থা করতে এফবিসিসিআইর পক্ষ থেকে অনেক দিন ধরে পরামর্শ দিলেও এ বিষয়ে অগ্রগতি নেই। তিনি জানান, হাসেম ফুডসের কারখানা ভবনের অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএসটিআই ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর, কলকারখানা অধিদপ্তরসহ নানা সংস্থা। তখন দায়সারাভাবে সংস্থাগুলো সনদ দিয়েছে। পরে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখেনি। এখন অনেকে তদন্ত কমিটি করে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছে। আগে থেকে নিলে ৫২ জন মানুষকে হারাতে হতো না।

এ বিষয়ে বিস্ম্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, কোনো কারখানায় পেট্রোকেমিক্যাল ব্যবহার করলে অনুমতি নিতে হয়। হাসেম ফুডস তাদের কাছ থেকে লাইসেন্স নেয়নি। তবে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে। এর মধ্যেই অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে।

গত শুক্রবার এ কারখানা প্রাথমিক পরিদর্শন শেষে বিস্ম্ফোরক পরিদর্শক মো. আব্দুর রব সমকালকে বলেন, তাদের অনুমতি নিয়ে আমদানি করা অগ্নিনির্বাপক অক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে। দুর্ঘটনার সময় এর ব্যবহার হয়নি। কেমিক্যাল ও গ্যাস ব্যবহারসহ নানা বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার সব যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ জন্য আবারও কারখানা পরিদর্শন করবে তাদের টিম। পরে আইন অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেবে বিস্ম্ফোরক পরিদপ্তর।

বিএসটিআইর সনদ নিয়ে নানা খাদ্যপণ্য তৈরি করে আসছে হাসেম ফুডস। সংস্থাটির সনদ নিতে কারখানায় স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ থাকতে হয়। কিন্তু সনদ নিয়ে কারখানা পরিচালনা করলেও মানা হয়নি তাদের নির্দেশনা। অবশ্য বিএসটিআইর উপপরিচালক মো. রিয়াজুল হক সমকালকে বলেন, এ কারখানায় পণ্য তৈরির কর্মপরিবেশ যাচাই করে সনদ দেওয়া হয়েছে। পরে পরিদর্শন করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।