নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুসের কারখানায় আগুনের ঘটনায় এখনও অনেকের খোঁজ মেলেনি। সময় যতই গড়াচ্ছে, স্বজনদের হতাশা ততই বাড়ছে। তৃতীয় দিনে এসেও খোঁজ না পাওয়ায় অনেকে ধরেই নিচ্ছেন, তার প্রিয় মানুষটি আর বেঁচে নেই। তাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে তারা ভিড় করেছেন লাশ পাওয়ার আশায়। কিন্তু সেই পথও সহজ নয়। বীভৎসভাবে পুড়ে যাওয়া মৃতদেহগুলো আর চেনার মতো অবস্থায় নেই। তাই স্বজনের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে শনাক্ত করা হবে লাশ। এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রতিটি মৃতদেহ একেকটি সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে তাদের পরিচয়।

মা-বাবার লাশের খোঁজে গতকাল শনিবার ঢামেক মর্গে এসেছিল বেশ কয়েকজন শিশু-কিশোর। তাদেরই একজন সাত বছরের সোমা আক্তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের সময় ভয় পেয়ে কাঁদছিল। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবরেটরির কর্মকর্তারা তাকে নানাভাবে বুঝিয়ে শান্ত করেন। নমুনা দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সে প্রশ্ন করে, 'কবে পামু আম্মুর লাশ?' মায়ের ছবি নিয়ে আসা শিশু নয়নের মুখেও ছিল একই প্রশ্ন।

শুধু সোমা বা নয়ন নয়, গতকাল ডিএনএ নমুনা দিতে আসা নিখোঁজ শ্রমিকদের ছেলেমেয়ে অনেকেই জানতে চাচ্ছিলেন কবে তারা লাশ পাবেন।

সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির সহকারী অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন সমকালকে বলেন, ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করে লাশগুলো শনাক্ত করতে ২১ থেকে ৩০ দিন সময় লাগবে। বিভিন্ন কারণে এর চেয়ে কম বা বেশি দিনও লাগতে পারে। তবে যথাসম্ভব দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চালাবে সিআইডি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, পুড়ে বিকৃত হওয়া মৃতদেহগুলো শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সেগুলো বিভিন্ন সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই সংখ্যার বিপরীতেই সংরক্ষণ করা হবে মৃতদেহ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ নমুনা। লাশগুলো কতদিন মর্গের হিমঘরে রাখা হবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে নিয়ম অনুযায়ী কয়েক দিন পর সেগুলো দাফন করে ফেলার কথা। সে ক্ষেত্রেও তাদের পরিচয় হবে ওই সংখ্যা। এর মধ্যে সিআইডি মৃতদের ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে স্বজনদের ডিএনএ প্রোফাইল মিলিয়ে দেখবে। দুটি প্রোফাইল মিললেই জানা যাবে তাদের নাম-পরিচয়। তখন স্বজনরাও জানতে পারবেন কোন কবরে চিরনিদ্রায় রয়েছেন তাদের প্রিয়জন।

শিশু সোমার মা অমৃতা বেগম কারখানার ষষ্ঠতলায় আচার বানানোর কাজ করতেন। গত ১ জুন তিনি এই কাজে যোগ দেন। থাকতেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের গোলাকান্দাইল এলাকায়।

সোমা জানায়, প্রতিদিন সকালে তাকে নাশতা খাইয়ে কর্মস্থলে যেত মা। তবে বৃহস্পতিবার সে ঘুম থেকে উঠে দেখে মা নেই। স্বজনরা তাকে বলেন, দ্রুতই মা বাসায় আসবে। তবে তার মা আর ফেরেননি। শুক্রবারও তার স্বজনরা ঢামেক মর্গে এসেছিলেন, কোনো খোঁজ পাননি।

পুড়ে যাওয়া কারখানাটির আরেক কর্মী মিনা খাতুনের সন্ধানে এসেছিলেন তার ছেলে দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া ওরফে লোক মিয়া। ২২ বছরের এই যুবক পেশায় গাড়িচালক। তিনি সমকালকে জানান, বৃহস্পতিবার তিনি ছিলেন পোস্তগোলায়। আগুন লাগার খবর পেয়ে তিনি ছুটে যান রূপগঞ্জে। তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। কারখানার চতুর্থ তলায় কাজ করতেন তার মা। বেতন ছয় হাজার টাকা। তিনি পরিবারের সঙ্গে রূপগঞ্জেই থাকতেন।

দেলোয়ার জানান, মায়ের খোঁজে সারারাত কারখানার সামনে ছিলেন তিনি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তিনি ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ফাঁকি দিয়ে আগুন লাগা ভবনটির ভেতর ঢুকে পড়েন। তৃতীয় তলা পর্যন্ত উঠতে পেরেছিলেন। তবে তীব্র ধোঁয়ার কারণে আর উঠতে পারেননি। এক পর্যায়ে তাকে দেখতে পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী ক্ষিপ্ত হয়ে চড় মারেন। পরে দায়িত্বশীল বিভিন্নজন তাকে বলেছেন, লাশ বের করা হলে তাকে দেখার সুযোগ দেওয়া হবে। সেখানে তার মা আছেন কিনা তিনি শনাক্ত করতে পারবেন। তবে শেষ পর্যন্ত লাশ দেখারও সুযোগ হয়নি। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢামেক মর্গে পাঠানোর খবর পেয়ে তিনি শুক্রবার এখানে আসেন। মায়ের খোঁজ না পেয়ে গতকালও এসেছিলেন। তিনি লাশ শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন।

মায়ের সন্ধানে সন্তানরা যেমন এসেছিলেন, তেমনি ছেলের খোঁজে এসেছিলেন বাবাও। ১২ বছরের শিশু হাসনাইনের সন্ধানে এসেছিলেন তার বাবা কৃষক ফজলুল হক। তার বাড়ি ভোলার চরফ্যাসন উপজেলায়। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ত তার ছেলে। অভাবের সংসারে অসুস্থ বাবাকে সহায়তা করতে এই বয়সেই সে কাজে যোগ দিয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে সেই ছেলেকে আর খুঁজে পাচ্ছেন না। তাই অসুস্থ শরীরেই এসেছেন ডিএনএ নমুনা দিতে।

বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস লিমিটেডের সেজান জুস কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৫২ জনের মৃত্যু হয়।