বাড়ির সামনে সরু গলি, সেই গলি গিয়ে মিশেছে বড় সড়কে। দিনভর সেই গলিতে হৈ-হল্লা করে বেড়াত নজিবা। ঈদের চাঁদ উঠলে পড়শি, বন্ধুরা একযোগে চাঁদ দেখতে বের হত। সরু গলিপথে আনন্দের রোল উঠত। নজিবা ও তার ছোট্ট দুই ভাইও আনন্দে মেতে থাকত।

সেই দিনগুলো পেরিয়ে একদিন সকালে নজিবা দেখে বাড়ির চারপাশে সশস্ত্র জোয়ান। ছোট্ট গলিপথের এখানে-ওখানে মৃতদেহ। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে প্রাণভয়ে ছুটছেন প্রতিবেশীরা। হঠাৎ নজিবার হাত ধরে ছুটলেন মা। নজিবা চকিতে ফিরে দেখে, বাড়ির সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন বাবা নূর হাকিম।

তারপর পাহাড় পেরিয়ে উত্তাল নাফ নদে নৌকা ভাসায় রোহিঙ্গাদের দল। নজিবা আর দুই সন্তানকে নিয়ে হতভাগ্য মা সওয়ার হন সেই নৌকায়। তারপর তাদের ঠাঁই হয় টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে। 

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের জাতিগত সংঘাতে নজিবার মতো আরও অনেক শিশু হারিয়েছে তাদের বাবাকে। কেউ হারিয়েছে মা, ভাইকে। কেউবা হয়েছে এতিম।

টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে হাজারো রোহিঙ্গা এভাবে প্রিয়জন হারানোর শোককে সঙ্গী করে ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন এবার। 

বুধবার ভোরে লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের মসজিদগুলো থেকে ভেসে আসে আযানের ধ্বনি। রোহিঙ্গা শিবিরে তখন ঈদুল আযহার আমেজ। নানা রঙে-ঢঙে সেজে সাজেন রোহিঙ্গারা। ঈদের নামাজ আদায়ের পর শুরু হয় পশু কোরবানির তোড়জোড়। শিশু-কিশোরের দল দৌড়ে বেড়ায় এ পাড়া ওই পাড়া।

আরও অনেক কিশোরীর মত নজিবাকেও সাজিয়ে দেয় মা। কিন্তু তার কাজলটানা চোখের কোণে জমা জলের খবর রাখে ক’জনে!

সারা সকাল দস্যিপনা শেষে ক্লান্ত নজিবা তাকিয়ে থাকে নাফ নদের অথৈ জলরাশির দিকে। অপেক্ষায় দিন গুণে, একদিন এই নাফ নদ পাড়ি দিয়ে ফিরে যাবে মাতৃভূমিতে। বাবাকে কোথায় দাফন করা হয়েছে, তা জানে না নজিবা। কিন্তু প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা তার মতো হাজারো রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীর।

বুধবার সকাল ৭টা থেকে কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে ছোট-বড় ১০টি মসজিদে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজ শেষে হারিয়ে ফেলা স্বজনদের জন্য দোয়া কামনা করেন তারা। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। 

মর্যাদার সঙ্গে নিরাপদে দেশে প্রত্যাবাসনসহ করোনা মহামারি থেকে গোটা বিশ্বকে যেন আল্লাহ হেফাজত করেন, সেই দোয়াও করেন তারা।


২০১৭ সালে ২৫ আগষ্ট কোরবানি ঈদের মাত্র ক'দিন আগে রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী সংগঠন আরসা রাখাইন রাজ্যের ৩৪টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলা চালায়। এর পাল্টা হিসেবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নমূলক অভিযান শুরু করে। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।  

উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি শিবিরে এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। তবে বহিরাগমন বিভাগ ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সূত্র মত, এ পর্যন্ত ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ জন রোহিঙ্গার নিবন্ধন শেষ হয়েছে। 

বুধবার সকালে টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা শিবিরে দেখা মেলে তাহেরা বেগমের। 

রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা তাহেরা বেগম ঈদুল আযহার দিনকয়েক আগে  স্বামী ও দুই ভাইকে হারান। রাখাইন রাজ্যে জাতিগত সংঘাতে বাস্তুচ্যুত তাহেরা বেগমের আশ্রয় হয়েছে টেকনাফের এক রোহিঙ্গা শিবিরে। 

সমকালকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার পর কতগুলো ঈদ চলে গেল। খুশি বলতে কিছু আর কী আছে আমাদের জীবনে? বেঁচে আছি। কিন্তু এটাকে কি বেঁচে থাকা বলে? আমার চোখের সামনে গুলি করল সেনারা। মারা গেল আমার স্বামী আর ভাই দুইটা। কত প্রতিবেশী মারা গেল তাদের গুলিতে। পাশের বাড়িতে গোটা এক পরিবারকে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে খুন করল তারা। এখনও রাতে স্বপ্নে সেসব দৃশ্য ফিরে আসে।’ 

স্বজন হারানোর পর কী বিভীষিকাময় সময় পার করে এসেছেন রোহিঙ্গারা সে কথা জানালেন মংডুর জামবুনিয়া রাঙ্গাবালি গ্রামের বিধবা ছকিনা খাতুন।

তিনি সমকালকে বলেন, ‘রাখাইন প্রদেশে বসবাস হলেও মিয়ানমার সরকার আমাদের নাগরিকত্ব দেয়নি। তারপরও সন্তান ও নাতি-নাতনি নিয়ে সুখে দুঃখে কেটে যাচ্ছিল জীবন। কিন্তু এক ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।’

মংডুর আরেক বাসিন্দা আলী জোহার আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলেও ঘরবাড়ি হারিয়ে নিদারুণ বিপাকে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘২৫ বছর রাখাইন রাজ্যে বিশাল আয়োজনে ঈদ করেছি।  গ্রামের লোকজন ঘরে এসে সেমাই ও চালের রুটির সঙ্গে রান্না করা গরুর মাংস খেয়েছে। আর এখন সেমাইর জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। এটা বড়ই লজ্জার, কষ্টের ।’

তিনি বলেন, ‘জন্মভূমিতে আর ফেরা হবে কিনা- জানি না। এই দেশে কত দিন বোঝা হয়ে থাকব- তাও জানিনা!’


টেকনাফের লেদা শিবিরের ডেভেলপমেন্ট কমিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার অনেক করেছে। কিন্তু এভাবে অসহায় হয়ে আর কত দিন এ দেশের বোঝা হয়ে থাকব? রোহিঙ্গাদের মধ্যে ঈদের আনন্দ নেই। অনেকে কোরবানি দিতে পারেননি। মিয়ানমার আমাদের স্বদেশ। আমরা ফিরতে চাই। আমাদের যেসব শর্ত রয়েছে, তা মানলেই আমরা ফিরে যাব।’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে সব রোহিঙ্গা শিবিরে ঈদের নামাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঈদ উপলক্ষে নজরদারিতে রাখা হয়েছে সবকিছু।’