কর্দমাক্ত কাঁচা সরু সড়ক- কোথাও তাও ছিল না, ছিল আলপথ। এলাকার নিরুপায় মানুষ নীলকুমার নদী পারাপারে নিজেরাই বানিয়েছিলেন বাঁশের সাঁকো। ছিল না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। লেখাপড়া করতে চাইলে পরিচয় লুকিয়ে দুরুদুরু বুকে ভর্তি হতে হতো বাইরের কোনো স্কুল-কলেজে।

অসুখ হলে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতো তাদের- ভাগ্য ভালো থাকলে ধুঁকতে ধুঁকতেই বেঁচে উঠত তারা। ভূমি মালিকানার বৈধ কোনো কাগজপত্রও ছিল না। জমি বেচাকেনা হতো মুখে মুখে। ধর্মীয় বিধান মতে বিয়ে হলেও ছিল না রেজিস্ট্রি করার বালাই। ছিল না নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। এমনকি নিজেদের এলাকার বাইরে যাওয়ার কোনো আইনগত অধিকারও ছিল না কারও।

এক বা দুই বছর নয়- যুগের পর যুগ এভাবে পাড়ি দিতে হয়েছে ছিটমহলবাসীদের। দীর্ঘ ৬৮ বছরের সেই বঞ্চনা আর অবরুদ্ধ জীবনের কথাই বলছিলেন সমকালের কাছে অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ারছড়া শাখার সভাপতি আলতাফ হোসেন। দাসিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারে গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর সমকালের কথা হয় তার সঙ্গে।

আলতাফ হোসেন জানান, ছিটমহল বিলুপ্ত হওয়ার পর এই জনপদগুলো দেশের উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত হয়েছে। মাত্র ছয় বছরেই শিক্ষা, যোগাযোগ, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ দেশের বিভিন্ন মূলস্রোতে সম্পৃক্ত হতে পেরে বদলে গেছে তাদের জীবনযাত্রা। তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটি এখনও পুরোপুরি পাননি তারা। জমি রেকর্ড হয়, গেজেটও প্রকাশিত হয়, পাওয়া যায় খতিয়ানও। দিচ্ছেন ভূমি উন্নয়ন কর। কিন্তু শুধু দলিল রেজিস্ট্রি চালু না হওয়ায় জমি কেনাবেচা করতে পারছেন না তারা।

এমন প্রেক্ষাপটে আজ শনিবার ৩১ জুলাই উদযাপন হচ্ছে ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হওয়ার ষষ্ঠ বর্ষপূর্তি। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতের পর থেকে বিলুপ্ত হয়েছে ছিটমহল। ফলে ১৭ হাজার ১৬০ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের ভারতের ১১১টি ছিটমহল বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিলুপ্ত এসব ছিটমহলের মধ্যে সবচেয়ে বড়টিই হলো কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া। যার আয়তন এক হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর। এখানকার ছয় হাজার ৫২৯ জন অধিবাসী নাগরিকত্ব পেয়েছেন বাংলাদেশের। ছিটমহল বিলুপ্তির আড়াই মাসের মধ্যে ২০১৫ সালের ১৫ অক্টোবর দাসিয়ারছড়ায় এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দিয়েছিলেন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার প্রতিশ্রুতি।

গত ছয় বছরে অনেকটাই পাল্টে গেছে দাসিয়ারছড়া। ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে নীলকুমার নদীর পাকা সেতু পেরিয়ে আধা কিলোমিটার এগোতেই কালিরহাট বাজার দাসিয়ারছড়ার প্রাণকেন্দ্র। এখানে যাওয়ার পথে বামদিকে চোখে পড়ে কালিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন লালরঙা একতলা পাকা ভবন। বানিয়াটারি এবং কামালপুরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আরও দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই তিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪৪০ জন।

প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও এখানে স্থাপিত হয়েছে সমন্বয়পাড়া মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়, রাসমেলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কামালপুর মইনুল হক উচ্চ বিদ্যালয় ও কালিরহাট বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। এসব মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়ে এখন লেখাপড়া করছে পাঁচশরও বেশি শিক্ষার্থী। বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ। পাকা হয়েছে দাসিয়ারছড়ার ২৬ কিলোমিটার সড়ক। স্থাপন করা হয়েছে কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টার, ডিজিটাল সার্ভিস এমপ্লয়মেন্ট ও ট্রেনিং সেন্টার এবং তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক। দাসিয়ারছড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে গর্ভবতী নারীদের নিরাপদে সন্তান প্রসবের কার্যক্রম দ্রুতই শুরু হবে বলে জানান এখানকার কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার মিনহাজুল ইসলাম।

ফুলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ জানালেন, দাসিয়ারছড়াকে ভাগ করে ফুলবাড়ী সদর, কাশিপুর ও ভাঙামোড়- এই তিন ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করে বাসিন্দাদের সরকারের সামাজিক ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে।

বাসক গাছের সারি: দাসিয়ারছড়ায় এখন পাকা সড়কের দু'পাশে বাসক গাছের সারি। যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশবান্ধব এসব গাছের ঔষধি গুণসম্পন্ন পাতা বিক্রি করে বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন স্বামী পরিত্যক্ত, বিধবা ও তালাক পাওয়া ১৭ নারী।

উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে ২০১৯ সালের শেষ দিকে ১৫ হাজার বাসক গাছ লাগানো হয়। এই গাছের পাতা বিক্রির ৫ ভাগ অর্থ পাচ্ছে উপজেলা পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদ পাচ্ছে ১০ ভাগ। আর উপকারভোগীরা পাচ্ছেন ৮৫ ভাগ। সরকারের স্বপ্ন প্রকল্পের আওতায় কাজ করা ১৭ অসহায় নারীর কর্মকালের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তারপরও তারা আগামী ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই লভ্যাংশ পাবেন। এক্‌মি ওষুধ কোম্পানি এই পাতার ক্রেতা।

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন দাস জানালেন, বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার মানুষদের জীবন-জীবিকার উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। সংশ্নিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দ্রুত জমি কেনাবেচার দলিল রেজিস্ট্র্রি চালু করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।