করোনা আক্রান্ত পঞ্চাশোর্ধ্ব জুলেখা বেগমের প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। তার ফুসফুসও সংক্রমিত হয়েছে ৫৮ শতাংশ। আগে থেকেই তার ছিল ডায়াবেটিস, হৃদরোগসহ শারীরিক নানা জটিলতা। চট্টগ্রামের স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাটহাজারীর বাসিন্দা এই নারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় জরুরিভিত্তিতে প্রয়োজন হয় একটি আইসিইউ শয্যার। তবে নগরের কোথাও মিলছে না এ সেবা।

চট্টগ্রামে একটি আইসিইউ শয্যার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ জনকে। এরইমধ্যে জরুরিভিত্তিতে আইসিইউ শয্যা না পাওয়ায় মারা গেছেন বেশ কয়েকজন রোগী। এ পরিস্থিতিতে মুমূর্ষু ছেলেকে নিজের আইসিইউ শয্যা দিয়ে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এক মায়ের করুণ মৃত্যুর ঘটনা দাগ কেটেছে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে।

চট্টগ্রামের দুই সরকারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের ২৮টি আইসিইউ শয্যার একটিও খালি নেই। একই অবস্থা চট্টগ্রামের বিশেষায়িত মা ও শিশু হাসপাতালের। নগরের বেসরকারি হাসপাতালের চিত্রও ভিন্ন কিছু নয়।

নিউমোনিয়া ও করোনায় আক্রান্ত রাউজানের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সী মিলি বেগমের তীব্র শ্বাসকষ্টসহ অক্সিজেন সেচুরেশন দ্রুত কমে যাওয়ায় প্রয়োজন হয় জরুরি আইসিইউ সাপোর্ট। চট্টগ্রাম নগরের কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে একটি শয্যাও খালি পাননি তার ছেলে। মায়ের জন্য একটি শয্যা খালি হওয়ার অপেক্ষায় আছেন সারওয়ার আলম।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের করোনা রোগীদের জন্য থাকা ১০টি আইসিইউ শয্যার একটিও কয়েকদিন ধরে নেই খালি। একই অবস্থা সরকারি জেনারেল হাসপাতালেও। এখানে থাকা ১৮টি শয্যার প্রতিটিই গত কয়েকদিন ধরেই পূর্ণ। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা বাড়িয়ে ২০টি করা হলেও কিছুদিন ধরে প্রতিটি শয্যায় রোগী। অভিন্ন চিত্র চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও।

রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে জেনারেল হাসপাতালে চালু করা হয়েছে ১৮ শয্যার নতুন আরেকটি ইউনিট। বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে বাড়ানো হয়েছে ১২টি আইসিইউ শয্যা। বর্তমানে হাসপাতালটির ২৪টি আইসিইউ শয্যায় করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিনই করোনায় মৃত্যু ও শনাক্তে নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। এক দিনে সর্বোচ্চ ১৮ জনের মৃত্যুর পর টানা দুই দিন মারা গেছেন ১৭ জন করে। টানা কয়েক দিন ধরে দৈনিক নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে ১৩০০-এর বেশি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় এ যাবতকালের সর্বোচ্চ ১৪৬৬ জনের দেহে নতুন করে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণের হার ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরমধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা পার করল ৮১ হাজরের ঘর। মারা গেছেন ৯৫৮ জন।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি সমকালকে বলেন, অনেক রোগীর আইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হলেও খালি না থাকায় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আগে উপজেলায় রোগীর চাপ কম থাকলেও এখন শহরের তুলনায় গ্রামে আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। প্রতিদিন বেশিরভাগই মারা যাচ্ছে গ্রামের মানুষ। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে সরকারি ও বেসরকারিভাবে আইসিইউসহ সাধারণ শয্যা বাড়ানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, শয্যার সংখ্যা প্রকট হওয়ায় প্রয়োজন হলে হাসপাতালের ফ্লোরে বেড বিছিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে এত বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম হুমায়ুন কবির বলেন, কিছুদিন ধরেই ১০টি আইসিইউ শয্যার সবক'টিতেই রোগী ভর্তি। মুমূর্ষু অনেক রোগী আইসিইউ সাপোর্ট পেতে হাসপাতালে ছুটে এলেও শয্যা খালি না থাকায় দিতে পারছি না।

চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ সমকালকে বলেন, হাসপাতালে আশঙ্কাজনক হারে রোগীর চাপ বেড়েছে। শয্যা ৭০ থেকে বাড়িয়ে ৯০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিদিন এইচডিইউতেও বাড়তি রোগীর সেবা দেওয়া হচ্ছে। শয্যা বাড়িয়েও চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে।

জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. আবদুর রব মাসুম বলেন, বর্তমানে করোনা আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর অক্সিজেন সাপোর্টের প্রয়োজন হচ্ছে। প্রতিদিন আইসিইউ সাপোর্টের জন্য অনেকেই যোগাযোগ করলেও সবাইকে খালি হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে বলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই চিকিৎসকদের। আগের চেয়ে বর্তমানে কয়েকগুণ বেশি রোগীর অক্সিজেনের সাপোর্ট প্রয়োজন হচ্ছে। আগামীতে রোগীর চাপ আরও বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ট্রেজারার রেজাউল করিম আজাদ বলেন, ২০টি আইসিইউ, ১৭২টি সাধারণ শয্যা ও ১২ এইচডিইউর একটিও খালি নেই। পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই আইসিইউ শয্যার জন্য যোগাযোগ করলেও খালি না থাকায় দিতে পারছি না।

আগামী সপ্তাহ থেকে জেনারেল হাসপাতালে ৮ শয্যার এইচডিইউ চালুর কথা জানিয়েছেন এ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানজিমুল ইসলাম। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে গাইনি ওয়ার্ডে ১৮টি আইসোলেশন শয্যা নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে।