চট্টগ্রামে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে করোনাভাইরাস। প্রতিদিনই রেকর্ড সংখ্যক নতুন রোগীর দেহে শনাক্ত হচ্ছে ভাইরাসটির অস্তিত্ব। কয়েক মাস আগেও এক দিনে যেখানে এক থেকে দেড় শতাধিক নতুন রোগী শনাক্ত হতো, বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৩০০ জনে। প্রতিদিন এক থেকে দু'জনের মৃত্যুর হার ঠেকেছে ১০ থেকে ১৪ জনে। গত এক মাসে রেকর্ড ২৩ হাজারের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। চলতি মাসের মাত্র পাঁচ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন সাড়ে ৫ হাজারের বেশি মানুষ, প্রাণহানি হয়েছে ৫৭ জনের। রোগীর এমন দ্রুত ঊর্ধ্বগতি হারের কারণে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে 'ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই' অবস্থা। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়েও মুমূর্ষু অনেক রোগী ঠাঁই পাচ্ছেন না হাসপাতালে। এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করেও শয্যা না পেয়ে সীমাহীন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের।
বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্য প্রশাসন, চিকিৎসকসহ সংশ্নিষ্টদের। শয্যা খালি না থাকায় প্রতিদিনই অনেককে ফিরতে হচ্ছে হাসপাতাল থেকে। জরুরি মুহূর্তে শয্যা না পেয়ে অনেকে মারা যাচ্ছেন।
গত এক মাসে রেকর্ড ২৩ হাজার ১৯৫ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ২৬১ জন। বিগত দেড় বছরেও শনাক্তের এমন হার দেখেনি চট্টগ্রাম। প্রতিদিন গড়ে মারা গেছেন ৯ জন করে, আর প্রতিদিন গড়ে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৮০০ জন। মে মাসে ৯ হাজার ৬৬২ জন করোনায় আক্রান্ত হন এবং মারা যান ১৩২ জন। জুনে করোনা শনাক্ত হয় ৮ হাজার ৮১৯ জনের, প্রাণ হারান ১৮১ জন। এপ্রিলে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যু হলেও দুই মাসের ব্যবধানে জুলাইয়ে রেকর্ড ২৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ জুলাইয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ৩০ জুলাই সর্বোচ্চ এক হাজার ৪৬৬ জনের শরীরে শনাক্ত হয় করোনার অস্তিত্ব। ২৭ জুলাই এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু হয় ১৮ জনের। এর পরের দু'দিন টানা মৃত্যু হয় ১৭ জন করে। চলতি মাসের মাত্র পাঁচ দিনে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৫৮৭ এবং মারা গেছেন ৫৭ জন।
এ প্রসঙ্গে করোনা মোকাবিলায় গঠিত বিভাগীয় সার্ভেইল্যান্স টিমের প্রধান ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, 'চট্টগ্রামে আক্রান্ত রোগীর হার বহুগুণ বেড়েছে। এতে সরকারি-বেসরকারিভাবে শয্যা বাড়িয়েও হিমশিম খেতে হচ্ছে। কিছুদিন ধরেই কোনো হাসপাতালে শয্যা খালি থাকছে না। নতুন ইউনিট চালুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রোগীতে পরিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান বলেন, 'বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রতিনিয়ত নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ইউএনও, এসি ল্যান্ড, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করলেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি।
সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, গত এক মাসে চট্টগ্রামে রেকর্ড সংখ্যক রোগীর শরীরে করোনার অস্তিত্ব মিলেছে। চলতি মাসের শুরু থেকেই কয়েক গুণ বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে। নির্দিষ্ট শয্যার বাইরে বাড়তি শয্যা বসিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। হাসপাতালের বারান্দায়ও অনেককে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রশাসনের অনুরোধে শয্যা আরও ৩০টি বাড়িয়ে ১২০টি করা হয়েছে। তারপরও প্রতিদিন অনেকে ভর্তি হওয়ার জন্য যোগাযোগ করলেও শয্যা খালি না থাকায় দিতে পারছি না। বর্তমানের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে না এলে সামনে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হবে।
চট্টগ্রামের ডেডিকেটেড জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন ডা. আবদুর রব মাসুম বলেন, চট্টগ্রামে দ্রুতগতিতে বাড়ছে সংক্রমণের হার। এ কারণে আইসিইউর পাশাপাশি সাধারণ শয্যার চাপও বহুগুণ বেড়েছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম থাকায় প্রয়োজন হচ্ছে বাড়তি অক্সিজেন সাপোর্টও।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ট্রেজারার মো. রেজাউল করিম আজাদ বলেন, শয্যা বাড়িয়ে ১৭২টি করেও অনেককে জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ২০টি আইসিইউ ও ১২ এইচডিইউর একটিও খালি থাকছে না কিছুদিন ধরেই।
জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানজিমুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে গাইনি ওয়ার্ডে ১৮টি আইসোলেশন শয্যা নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে।
করোনা মোকাবিলায় গঠিত স্বাচিপের বিভাগীয় কমিটির সমন্বয়ক ডা. আ ম ম মিনহাজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সংক্রমণের হার। এতে কয়েকগুণ বেড়েছে রোগীর চাপ, যা সামাল দেওয়া কঠিন। সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত সবাইকে টিকার আওতায় আনতে হবে। মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধিও। না হয় সামনে আরও বড় বিপদ আসবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে কয়েক ধাপে শয্যা বাড়িয়ে ৩০০ করা হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালে নতুন করে চালু করা হয়েছে ১৮ শয্যার আরও একটি ইউনিট। চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯০ থেকে বাড়িয়ে শয্যা ১২০ করা হয়েছে। এশিয়ান স্পেশালাইজড হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চালু করা হয়েছে ১৬ শয্যার আইসিইউ ইউনিট। বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালেও শয্যাসংখ্যা শতাধিক করা হয়েছে। পার্কভিউ হাসপাতালে চালু করা হয়েছে নতুন ২৬টি শয্যা। এত শয্যা বাড়িয়েও কয়েকদিন ধরে একটিও ফাঁকা থাকছে না।