বুধবার রাত আড়াইটা। ময়মনসিংহের চুরখাই বাজারে খাবার হোটেলের সামনে বসে কাঁদছিলেন এক যুবক। কথা বলে জানা গেল, নাম তার সুলতান। পেশায় পিকআপ চালক। দুটি ব্যাটারিচালিত রিকশা নেত্রকোনার কলমাকান্দা থেকে ভাড়ায় পিকআপে নিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকার উত্তর বাড্ডায়। রাত ১টার দিকে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে পৌঁছালে কয়েকজন যুবক ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তার পিকআপ থামান। পরে নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয় দেন। আটকে রেখে মারধর করে তার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন। সঙ্গে থাকা রিকশা দুটিকে চোরাই আখ্যা দিয়ে আরও ৩০ হাজার টাকা দাবি করে। আটকে রাখা হয় রিকশাসহ দুই চালককে। তাদের মারধরও করা হয়।

সুলতান জানালেন, তিনি তার এলাকার চেয়ারম্যানসহ পরিচিতজনকে ফোন করছিলেন রিকশা দুটি ও চালকদের উদ্ধারে সহায়তা চেয়ে। জিম্মিকারী একজন নিজের নাম বলেছেন পিয়াস। অন্যজন শামীম। তিনি নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়েছেন। তার মোবাইল থেকে এক র‌্যাব সদস্যকে ফোন করেছিল। সেই র‌্যাব সদস্য রিকশা আটকে রাখতে বলেছেন।

সুলতান কাগজ দেখালেন, রিকশাগুলো চোরাই নয়। ভাড়ায় ঢাকায় নিতে নেত্রকোনা জেলা মোটরযান কর্মচারী ইউনিয়নের লিখিত অনুমতি রয়েছে। চালানের এই কাগজ দেখানোর পরও ওই দুই যুবক মানেননি। উল্টো আরও মারধর করেছেন।

রিকশা ও চালকদের জিম্মিকারীরা যে র‌্যাব সদস্যকে ফোন করেছিলেন, তার নম্বর ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে অনুসন্ধান শুরু করে সমকাল। ঘটনাস্থলে গিয়ে র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে। তাতে বেরিয়ে আসে, কিছু যুবক নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের নেতা পরিচয় দিয়ে এবং র‌্যাবের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন দাবি করে শম্ভুগঞ্জ এলাকায় চালকদের টাকা-পয়সা ছিনতাই করছে। অভিযোগ পেয়ে অভিযানে নামে ময়মনসিংহের র‌্যাব-১৪। পরে শামীম ও পিয়াসকে আটক করা হয়।

এর আগে সকাল ৭টার দিকে দুই রিকশাচালকের কাছ থেকে দেড় হাজার টাকা ও এক বস্তা চাল ছিনিয়ে নিয়ে রিকশা দুটি ছেড়ে দেন জিম্মিকারীরা। পরে দুই চালক রিকশা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ব্যাটারির চার্জ ফুরালে রিকশা প্যাডেল করে ঢাকায় পৌঁছান গতকাল রাতে। তাদের একজন জাহিদুল ফোনে সমকালকে বলেছেন, তাদের টাকা-চাল যা গেছে, গেছে। এ নিয়ে পুলিশে অভিযোগ করে নতুন করে বিপদে পড়তে চান না।

জিম্মিকারীরা যে র‌্যাব সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন তার নাম আনোয়ার। সমকালের কাছে তিনি দাবি করেছেন, ছিনতাইয়ের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। বুধবার রাত দেড়টার দিকে চালকের ফোন থেকে পিয়াস নামে একজন ফোন করে তাকে জানায়, চোরাই রিকশাসহ পিকআপ আটক করা হয়েছে। পাশ থেকে আওয়ামী লীগ

নেতা পরিচয় দিয়ে একজন বলেন, স্থানীয়ভাবে এর মীমাংসা করা হচ্ছে। এর বাইরে আর কোনো কথা হয়নি। যারা নিজেদের নেতা প?রিচয় দিয়েছেন, তারা র‌্যাব সদস্যকে জানিয়ে গাড়ি আটক বা তল্লাশি করতে পারে কিনা- এ প্রশ্নে আনোয়ার বলেন- না, পারে না। তিনি কাউকে গাড়ি আটক করতে বলেননি। শুধু জানতে চেয়েছিলেন, রিকশা পরিবহনের বৈধ চালান আছে কিনা। র‌্যাব-১৪-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার মোহা. রোকনুজ্জামান সমকালকে বলেছেন, কোনো র‌্যাব সদস্য জড়িত থাকলে ছাড় দেওয়া হবে না।

র‌্যাবের এএসপি মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে গতকাল শম্ভুগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালানো হয়। তিনি সমকালকে বলেন, র‌্যাবের নাম ভাঙিয়ে কেউ অপকর্ম করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না- নেতা বা যে পরিচয়ই দিক। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, গোয়েন্দা কার্যক্রম চালাতে গিয়ে অনেকের কাছেই র‌্যাব সদস্যদের নম্বর থাকতে পারে। হয়তো সেভাবেই আনোয়ারের নম্বর সংগ্রহ করেছিলেন ওই দুই যুবক। তার মানে এই নয় যে, এ ঘটনার সঙ্গে র‌্যাব জড়িত। তিনি আরও বলেন, এই শামীম এর আগেও সার্জেন্ট পরিচয়ে অপকর্ম করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিল।

এর আগে শম্ভুগঞ্জ এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, মোড়ে সিটি করপোরেশনের ইজারাদাররা টোল আদায় ক?রছেন। এর ৫০ গজ সামনে বুধবার মধ্যরাতে সুলতানের ঢাকা মেট্রো-ন-২০-৭০৫৮ নম্বরের পিকআপটিকে আটক করেছিল জিম্মিকারীরা। টোলের কর্মীরা জানালেন, দীর্ঘদিন ধরেই এমন অপকর্ম চলছে। নেতা পরিচয় দিয়ে দামি মোটরসাইকেলে চড়ে রাতে রাস্তায় গাড়ি আটকায় কিছু যুবক। তল্লাশির নামে চালক ও যাত্রীদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়।

সুলতানের পিকআপে থাকা হৃদয় নামের যুবক সমকালকে জানান, ডিবি পুলিশ ও নেতা পরিচয়ে জিম্মিকারী পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেছিল। হাতেপায়ে ধরে দুই হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। সকালে আবার হৃদয়ের সঙ্গে কথা হয়। তখন তিনিই জানান, সাংবাদিকরা খবর পেয়েছে, এ খব?রে রিকশা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর আর সারাদিনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি সমকাল। তার মোবাইল ফোন বন্ধ। জাহিদুলের সঙ্গী রিকশাচালকের মোবাইল ফোনও বন্ধ।
শম্ভুগঞ্জ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। ময়মনসিংহ মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মোহাম্মদ শাহীনুর রহমান সমকালকে বলেছেন, ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে যুবলীগের কমিটি নেই। শামীম নামে তাদের কোনো নেতা বা কর্মী শম্ভুগঞ্জ এলাকায় নেই। কেউ যুবলীগ পরিচয়ে গরিবের টাকা-চাল ছিনতাই করলে তাকে পুলিশ ধরুক। পরে শামীমের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তিনি জানান, আগে যুবলীগের সদস্য ছিলেন তিনি। এখন কোনো পদে নেই। তবে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

রিকশাচালক জাহিদুল জানালেন, তারা হতদরিদ্র। বন্যায় ঘরে পানি। তাই রিকশা নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন রুটি রুজির আশায়।

পিকআপ চালক সুলতান দুপুরে দুই চালকের কলমাকান্দার মনতলার বাড়িতে যান। সেখান থেকে তিনি টেলিফোনে সমকালকে বলেন, দুই রিকশাচালক খুবই গরিব। সরকারের দেওয়া ঘরে থাকেন। তারা ধরা পড়েছেন, খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন কান্নাকাটি করছেন। দুই চালক অভিযোগ করতে রাজি না হলেও সুলতান আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।