প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের নভেম্বরে ময়মনসিংহ সফরকালে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ডিপোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে তৈরি সেই ডিপোর নির্মাণকাজের অগ্রগতি সামান্যই। ডিপো না থাকায় বিদেশি ঋণে কেনা বাস উন্মুক্ত স্থানে রাস্তায় রাখা হয়েছে। রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থার কোটি টাকার বাস।
গত ১৯ আগস্ট দিঘারকান্দায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশে সারি বেঁধে রাখা হয়েছে বিআরটিসির লাল-সবুজ একতলা ও দ্বিতল বাস। জানা গেল, লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকার পুরো সময় বাসগুলো দিনরাত রোদ-বৃষ্টিতে সড়কে রাখা হয়। বাসের যন্ত্রাংশও চুরি হয়। চাকা ও ব্যাটারি খোয়া গেছে। গত বছরের ১৫ জুলাই যন্ত্রাংশ চুরির মামলায় দু'জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু ডিপো না থাকায় রাস্তা ছাড়া সেগুলো রাখার জায়গাও নেই।
যাত্রীসেবায় ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ ময়মনসিংহ থেকে বিভিন্ন রুটে চালু হয় বিআরটিসির ৪৭টি বাস। বেসরকারি পরিবহন মালিকদের চাপে কয়েকটি রুট বন্ধ হওয়ায় এখন চলছে ২৮টি। এর মধ্যে ২৪টিই ২০১৯ সালে ভারতীয় ঋণে কেনা বাস। ২০১৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে সই হওয়া দ্বিতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) চুক্তিতে ৫৮১ কোটি টাকায় ৬০০ বাস এবং ২১৭ কোটি টাকায় ৫০০ ট্রাক কেনা হয় ভারত থেকে।
ভারত থেকে ৩০০ দ্বিতল (ডাবল ডেকার), ১০০ একতলা সিটি এসি বাস, ১০০ একতলা দূরপাল্লার এসি বাস এবং ১০০ একতলা নন-এসি বাস কেনা হয়েছে। অশোক লিল্যান্ডের তৈরি প্রতিটি ডাবল ডেকার বাসের জন্য খরচ হয়েছে ৭৯ লাখ টাকা। প্রতিটি একতলা এসি বাস ৭৬ লাখ টাকায় এবং টাটার একতলা নন-এসি বাস ৪৬ লাখ টাকায় কেনা হয়েছে।
ডিপো ম্যানেজার আবদুল কাদের জিলানী সমকালকে জানান, ময়মনসিংহে ১০টি ডাবল ডেকার, ছয়টি একতলা এসি এবং আটটি টাটার একতলা বাস দেওয়া হয়েছে। লকডাউনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাড়া দেওয়া চারটি বাস রাস্তার পাশে রাখা রয়েছে। বাকিগুলো চলছে।
বিআরটিসির সদর কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ময়মনসিংহ ডিপোকে ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার নতুন বাস দেওয়া হয়েছে। বাস পরিচালনার আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করতে হবে বিআরটিসিকে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাকে সরকার অতীতে যত বাস কিনে দিয়েছে তার ঋণ শোধ করতে পারেনি বিআরটিসি। সংস্থার মাথায় প্রায় সাড়ে ৭০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা রয়েছে।
বিআরটিসি আইন অনুযায়ী সংস্থাটি নিজের আয়ে চলবে। লকডাউনের আগে এ বছরের শুরুতে বিআরটিসি লাভের মুখ দেখলেও অতীতের ঋণ শোধ প্রায় অসম্ভব। সরকারের কিনে দেওয়া বাস-ট্রাকের আয়ে বছরখানেক ধরে কর্মীদের বেতন দিতে পারলেও আগের বকেয়া রয়েছে। বর্তমান সরকার গত ১২ বছরে বিআরটিসিকে এক হাজার ৫৫৮টি বাস কিনে দিয়েছে।
বিআরটিসির বহরে বর্তমানে বাস সংখ্যা এক হাজার ৬৫০টি। এর মধ্যে সচল বাসের সংখ্যা এক হাজার ২৬৮টি। বাকি ৩৮২টি অচল, নয়তো ভারী মেরামত প্রয়োজন। বেসরকারি বাস অনায়াসে ২০-২৫ বছর চললেও বিআরটিসির বাস সর্বনিম্ন আয়ুস্কাল ১২ বছরও চলছে না। আবার সচল বাসের সবগুলোও সড়কে চলে না। দৈনিক বিআরটিসির বাস চলে ৯২০ থেকে ৯৮৫টি। বাকিগুলো ডিপোতে বসে থাকে।
১৯ আগস্ট ময়মনসিংহেও একই দৃশ্য দেখা যায়। বেসরকারি মালিকদের বাস সড়কে চললেও বিআরটিসির আটটি বাস মহাসড়কের পাশে নিশ্চল দাঁড়িয়ে ছিল। বাস রাখার ডিপোর কাজ না এগোলেও জনবল রয়েছে ৫৯ জন।
ডিপো নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক বিআরটিসির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) নুরুল আফছার ভূঁঞা। তার বরাতে প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্রের দায়িত্বে থাকা মহাব্যবস্থাপক (জিএম) আমজাদ হোসেন সমকালকে বলেছেন, প্রায় তিন বছর আগে ডিপোর উদ্বোধন হলেও কাজের অগ্রগতি ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। আগামী জুনে কাজ শেষ হবে।
কিন্তু ব্রহ্মপুত্র নদ ঘেঁষা নগরীর শম্ভুগঞ্জের চরঈশ্বরদিয়া এলাকায় লালকুঠি দরবার শরিফের পাশে পুরাতন ফেরিঘাটে ডিপোর নির্মাণ এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, মাটি ভরাটের কাজ চলছে। অবকাঠামো নির্মাণ এখনও শুরুই হয়নি। তারপরও কিসের ভিত্তিতে বিআরটিসি দাবি করছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাব জানতে গত ২৪ ও ২৫ আগস্ট দফায় দফায় নুরুল আফছার ভূঁঞার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
পুরাতন ফেরিঘাটে গিয়ে দেখা যায়, সাইনবোর্ডেই আটকে আছে বিআরটিসির বাস ডিপো ও ট্রেনিং সেন্টারের নির্মাণকাজ। ট্রাক ভরে ফেলা মাটি বৃষ্টির পানিতে নদীতে চলে যাচ্ছে। সেখানে কথা হয় চরকালীবাড়ি এলাকার আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে। তিনি পেশায় পিকআপ চালক। তিনি জানান, কিছুদিন পরপর কর্মকর্তারা এসে শুধু ফিতা দিয়ে জমি মেপে যান। এছাড়া আর কোনো কাজ হতে দেখেননি।