ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

৭৩ কি.মি. বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ

৭৩ কি.মি. বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ

বরগুনা সদর উপজেলার পালের বালিয়াতলী এলাকার বেড়িবাঁধ পায়রা নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে সমকাল

আবু জাফর সালেহ্, বরগুনা

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৩ | ২২:৩২

একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগর ঘেঁষে বরগুনার খরস্রোতা পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর নদীর তীব্র ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বাজার, বসতবাড়িসহ, ফসলি জমি। ভিটেবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে এক সময়ে ভালো থাকা পরিবারগুলো।
বাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কার্যক্রম থাকলেও তা যেন কাজে আসছে না উপকূলের মানুষের জানমাল রক্ষায়। টেকসই বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের বাইরে যেসব জায়গায় সংস্কার করা হচ্ছে, তাও কাজে আসছে না। টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি উপকূলের মানুষের। 
বরগুনা জেলার ২২টি পোল্ডারের আওতায় ৮০৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটার বাঁধের তীর সংরক্ষণ, ৯ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ এবং ৫১ কিলোমিটারের মেরামতের কার্যক্রম চলমান আছে। এ ছাড়া ৬৯ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, মেরামত এবং নদী সংরক্ষণের জন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় প্ল্যানিং কমিশনে রয়েছে। তবে সদর উপজেলার পালের বালিয়াতলী এলাকায় দেড় কিলোমিটার এবং তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া এলাকায় আড়াই কিলোমিটার বাঁধ বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার পালের বালিয়াতলী গ্রামের রফিকুল ইসলাম। ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেও তাঁর ছিল ফসলি জমি ও বিশাল বসতবাড়ি। কিন্তু খরস্রোতা পায়রা নদীর করাল গ্রাসে এক পর্যায়ে চলে গেছে বাড়িটাও। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পরে বেড়িবাঁধের ভেতরে নতুনভাবে বসতি করেন রফিক ও তাঁর পরিবার। তবে সেখানেও রক্ষা নেই। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নদীর কবলে চলে গেছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। নতুন করে বিলীন হচ্ছে তাদের বসতবাড়ি। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে এখন হতবাক রফিকুল। 
সরেজমিন গেলে এ বিষয়ে কথা হয় রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পায়রা নদীর ভাঙনে ফসলি জমি হারিয়েছি অনেক আগেই। সিডরের আঘাতে হারিয়েছি বসতবাড়িও। বেড়িবাঁধের পাশে বসতঘর তুলে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে আসছিলাম। কিন্তু কয়েকটি ঘূর্ণিঝড়সহ সর্বশেষ মিধিলির আঘাতে বেড়িবাঁধটিও বিলীন হয়ে গেছে। এখন আমার বসতঘরের ওপর দিয়ে নতুন বেড়িবাঁধ যাচ্ছে। আমার আর থাকার কোনো স্থান নেই। জানি না আল্লাহ কোথায় রাখার জায়গা করবেন।’    
শুধু রফিকুল ইসলামই নন, গত দুই বছরের ব্যবধানে বসতবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে একই এলাকার অন্তত ২০০ পরিবার। বিলীন হয়ে গেছে গ্রাম্য বাজার, মসজিদ, কবরস্থানসহ অনেক স্থাপনা। ভাঙন মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জরুরি সংস্কারের নামে যেনতেন কাজ শুধু সাময়িকের। মানুষের জানমাল রক্ষায় এসব কাজে কিছুই হবে না বলে দাবি স্থানীয়দের।
সদর উপজেলার পালের বালিয়াতলী এলাকার মো. ছগির হোসেন বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর আগে থেকে বেড়িবাঁধ রক্ষায় মানববন্ধনসহ বিভিন্নভাবে সরকার এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে বেড়িবাঁধটি বিলীন হয়ে গেছে। এখন যেনতেনভাবে বাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে। তবে এ মেরামতে স্থানীয়দের জানমাল রক্ষায় কোনো কাজে আসবে না।’
অন্যদিকে জরুরি মেরামতের নামে একাধিকবার জেলার তালতলী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া ও জয়ালভাঙ্গা এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই তা নদীতে বিলীন হয়ে 
যায়। ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে সাগর উপকূলীয় মানুষ। জেলার পাথরঘাটা উপজেলার জ্বীনতলা, পদ্মা, কালমেঘা, কাকচিড়া, বামনা উপজেলার রামনা, বামনা এবং বেতাগী উপজেলার কালিকাবাড়ীসহ একাধিক পয়েন্টে অন্তত ৭৩ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ। 
স্থানীয়দের ভাষ্য, এমন বাঁধ নির্মাণ উপকূলীয় মানুষের জানমাল রক্ষায় কোনো কাজে আসবে না। ব্লক অথবা টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি তাদের।
জেলার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান বাচ্চু হাওলাদার বলেন, গত ১০ বছরে তেঁতুলবাড়িয়া এবং জয়ালভাঙ্গা এলাকার বেড়িবাঁধ কয়েকবার সংস্কার করা হয়েছে। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই তা আবার নদীতে চলে যায়। তাই জিওব্যাগ অথবা ব্লক দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান তিনি। অন্যথায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে বসতবাড়ি এবং 
ফসলি জমিসহ জীবনহানির আশঙ্কা থাকবে সাগর পাড়ের এসব মানুষের।
বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব বলেন, ইতোমধ্যেই বরগুনার দুটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। আরও দুটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে পর্যায়ক্রমে বরগুনার ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ অনেকটা সংস্কার হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে কোথাও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তা জরুরি মেরামতের ব্যবস্থা করা হবে। 

আরও পড়ুন

×