দুই দফা সময় বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুনে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু এবার বলা হচ্ছে, সেই সময়েও শেষ হবে না নির্মাণ কাজটির। রাজধানীর বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত নির্মাণাধীন এই সাড়ে ২০ কিলোমিটার বিআরটির কাজ শেষে আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ চালু হবে।

প্রকল্পটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঢাকা বিআরটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তারায় ঢাকা বিআরটি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে প্রকল্পের অগ্রগতি, নির্মাণ কাজের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

স্বল্প ব্যয়ে স্বল্প সময়ে নির্মাণ করে স্বাচ্ছন্দ্যে যাত্রী পরিবহনের জন্য অন্যান্য দেশে সফল বিআরটি। বাংলাদেশে তা নির্মাণে ২০১২ সালে প্রকল্প নেওয়া হয়। পরের বছরের ৩১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু কাজই শুরু হয় ২০১৮ সালে। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ২৬৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এবার ব্যয়ও আরও কিছু বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন এমডি।

বিআরটির নির্মাণ কাজের কারণে দেশের সবচেয়ে ব্যস্ততম সড়ক ‘আবদুল্লাহপুর-টঙ্গী-জয়দেবপুর’ অংশে যানজট লেগেই থাকে। ১৩ কিলোমিটার পথ পার হতে বর্ষার শুরুতে আট দশ ঘণ্টাও লেগেছে। এখন লাগছে দুই তিন ঘণ্টা। এ দুর্ভোগের কারণে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে।

ঢাকা বিআরটির এমডি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আগামী বছরের ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১০ লেনের টঙ্গী সেতু এবং ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১৬ কিলোমিটার বিআরটি লেনের কাজ শেষ হবে। এরপর আনুষঙ্গিক কাজ শেষে আগামী বছরের ডিসেম্বরে বাসের জন্য নির্মিত বিশেষায়িত লেন তথা বিআরটি চালু হবে। এরপর পিকআওয়ারে ঘণ্টায় দুই দিক থেকে ২০ হাজার যাত্রী পরিবহন সম্ভব হবে। ৩৫ থেকে ৪০ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত পৌঁছা যাবে নিশ্চিতভাবে।

২০১৬ সালে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) অনুযায়ী, জয়দেবপুরের শিববাড়ি থেকে বিমানবন্দর হয়ে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল পর্যন্ত বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ হয়েছে। কিন্তু পরে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর অংশের নির্মাণকাজে চরম জনদুর্ভোগের কারণে বাকি অংশ নির্মাণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

সোয়া চার হাজার কোটি টাকায় নির্মিত খণ্ডিত বিআরটি কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। শফিকুল ইসলাম বলেছেন, তারা আশা করছেন বিআরটি চালুর পর এর সাফল্য দেখে সরকার বাকি অংশ নির্মাণের অনুমতি দেবে। বাকি অংশ নির্মিত না হলেও গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের লাখ লাখ যাত্রী সুফল পাবে। উত্তরারা দিয়াবাড়ি থেকে মেট্রোরেল নির্মিত হচ্ছে। বিআরটিকে মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করতে শাটল সার্ভিস চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা পরবর্তী গন্তব্যে যেতে পারবেন। মহাখালী থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত শাটল চালু করা যেতে পারে।

এমডি জানিয়েছেন, বিআরটিতে নন এসি, এসি, প্রিমিয়াম তিন ধরনের বাস থাকবে। বিপননের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে কিলোমিটার প্রতি এক টাকা ৭০ পয়সা ভাড়ায় বিআরটির ১২ মিটার লম্বা যাত্রীবান্ধব বাস চড়া যাবে। পরে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ভাড়া বাড়বে। প্রতিটি দুই কোটি টাকা দামে ১০০ বাস কেনা হবে। তা বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ করে চালানো হবে। নিজে ব্যবসায় নেমে বিআরটি আরেকটি বিআরটিসি হতে চায় না। ঢাকা-গাজীপুর রুটে যেসব বাস এখন চলছে, সেগুলো বিআরটি চালুর পর আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত যাবে।

শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৬৩ শতাংশ। সাড়ে চার কিলোমিটার এলিভেটেড বিআরটি লেন এবং পুরো পথে থাকা ২৫ স্টেশনের নির্মাণ কাজের অগ্রগতি ৬১ শতাংশের বেশি। বিআরটি লেনের পাশে সবধরনের যান চলাচলে চারলেনের যে সড়ক থাকবে, তার কাজও শেষের পথে। ফলে দুর্ভোগ ইতোমধ্যে কমে এসেছে। আগামী ডিসেম্বরে জয়দেবপুর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত চারলেনের সড়ক এবং দুই পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আরও দুই লেনের সড়ক নির্মাণের কাজ শেষ হবে। তখন আর যানজটের দুর্ভোগ থাকবে না।

নির্মাণ কাজের দুর্ভোগের দায় নিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেছেন, দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত সড়কে যান চলাচল চালু রেখে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ ছিল সবচেয়ে কঠিন। জনদুর্ভোগ হলেও এ কাজ তারা সফলভাবেই করতে পেরেছেন। এসময় প্রকল্পের নকশায় ভুল থাকার অভিযোগ নাকচ করেন এমডি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্পের পরিচালক এসএম ইলিয়াস শাহ, পরামর্শক ড. মাহবুবুল বারী, কোম্পানি সচিব সাইফুল ইসলামসহ অন্যান্যরা।