বেআইনিভাবে আইন প্রয়োগ করা হলে আইনি কার্যক্রমের উদ্দেশ্যটাই শুরুতে জখম হয়ে যায়। পরে তদন্ত, বিচার প্রক্রিয়া যা-ই হোক, এসবের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হতে থাকে এবং ক্রমে আইনের শাসন সুদূরপরাহত হয়ে যায়। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে যে বিষয়টি প্রবলভাবে আলোচিত হচ্ছে, তা হলো একসঙ্গে ১১ জন সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব। সাংবাদিকরা প্রতিবাদ করছেন, একযোগে রাজপথে নেমেও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন। সম্পাদক পরিষদ প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতিতে বলেছে, এরকম ঘটনা দেশে আগে কখনও কোনো পেশার ক্ষেত্রেই ঘটেনি। এ ধরনের ঘটনা 'স্বাধীন সাংবাদিকতা পেশার ওপর চাপ ও হুমকি' বলে পরিষদ মনে করে।
কীসের প্রতিবাদ ও কেন প্রতিবাদ তা একটু পরিস্কার হওয়া দরকার। কারণ সমাজে নানারকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হচ্ছে। এই ফেসবুক-ইউটিউবের যুগে বিভিন্ন স্তরের মানুষের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াও সহজে বোঝা যায়। এটা ভালো। মানুষের স্বাধীনতা থাকা ভালো। কেউ বলছেন, সাংবাদিকদের কাছে তাদের টাকা-পয়সার হিসাব চাওয়া হয়েছে, তারা দেবেন না কেন? প্রতিবাদ কেন? তাদের কি সম্পদ গোপন করা দরকার?
এ রকম আক্রমণ থেকে বোঝা যায়, যারা এভাবে হিসাব তলব করেছেন তাদের উদ্দেশ্য প্রাথমিকভাবে সিদ্ধ হয়েছে। ওই ১১ জন সাংবাদিকের দু'চারজনের
হিসাবে কোনো অস্বচ্ছতা থাকুক বা না থাকুক, তারা কোনো অপরাধ করুন বা না করুন, পুরো সাংবাদিক সমাজ বা তাদের নেতারা অন্তত দলবেঁধে জনমনে 'চোর' হয়ে গেলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়াগুলো সম্পর্কে অনেকের প্রাথমিক জ্ঞান না থাকলেও মন্তব্য করতে পারেন। যেমন, ব্যাংক লেনদেনের হিসাব তো ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের কাছে চাওয়া হয়নি। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গোয়েন্দা সংস্থা। মন্তব্য করা হচ্ছে, সাংবাদিকরা হিসাব দেবেন না কেন?
সংশ্নিষ্ট সাংবাদিকরা হিসাব দিতে চান না, তা মোটেই নয়। ওই তলবের প্রতিক্রিয়ায় এগারোজনের পক্ষে প্রথম দিনই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন ও সম্পাদক ইলিয়াস খান মিডিয়াকে বলেছেন, তারা এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানান; সরকার যে-কোনো সময় যে কারও ব্যাংকের হিসাব চাইতে পারে, তবে নির্বাচিত সাংবাদিক নেতাদের হিসাব একত্রে চাওয়ায় জনমনে ভুল বার্তা যেতে পারে। তাদের আপত্তি এখানেই। এবং হিসাব যখন চাওয়া হয়েছে, তখন সরকারি সংস্থাকে এই হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। পরে প্রতিবাদকালেও সাংবাদিকরা ও সম্পাদক পরিষদ এ মর্মেই কথা বলেছেন।
এখানেই আইন প্রয়োগের আইনি প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্যের সততার প্রশ্নটি আসে। লেখার শুরুতেই এ কথাটি আমি কেন বলেছি, তা একটু খোলাসা করি।
আইন কি বেআইনিভাবে প্রয়োগ করা যায়? আইনি শাস্ত্র ও বিধান যা-ই বলুক, দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে অন্তত গত দুই দশক ধরে এই অপপ্রয়োগের নজির দেখছি এবং আশঙ্কাজনকভাবে এ প্রবণতা বাড়ছে ও তার ক্ষেত্র বিস্তার হচ্ছে। সম্প্রতি প্রদর্শনমূলক ব্যাপক অভিযান চালিয়ে চিত্রনায়িকা পরীমণিকে গ্রেপ্তার ও নাট্যপরিচালক চয়নিকা চৌধুরীকে রাস্তা থেকে নাটকীয়ভাবে আটকের ঘটনাসূত্রে গত ১৪ আগস্ট সমকালে 'পুলিশের আইন প্রয়োগ ও ব্যক্তির মর্যাদা' শিরোনামে আমার লেখায় বেআইনি আইন প্রয়োগের পদ্ধতিগুলোর উল্লেখ করেছিলাম। সেগুলো হলো- সাদা পোশাকে পুলিশের দায়িত্ব পালন, যখন-তখন পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার, সাদা পোশাকে তুলে নিয়ে কয়েকদিন গোপন জায়গায় জিজ্ঞাসাবাদে নির্যাতন চালিয়ে পরের একটি তারিখে থানায় সোপর্দ করে গ্রেপ্তার দেখানো ইত্যাদি এবং 'ক্রসফায়ার' অবধি।
ক্রসফায়ারটাই শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে। তার আগে ২০০২ সালেই ঘোরতর অপরাধ দমনের 'অপারেশন ক্লিন হার্ট' চালিয়ে মানুষ মেরে পরে দায়মুক্তির আইন করতে হয় সরকারকে। সে ছিল বিএনপির সরকার। কিন্তু ক্রসফায়ার কি আওয়ামী লীগের সরকারও অব্যাহত রাখেনি এবং আরও বেশি হয়নি? দেশে-বিদেশে 'বিচারবহির্ভূত হত্যা' বলা হলেও ক্রসফায়ারকে ওই অভিধায় মানতে সরকার নারাজ, তবে যখন খোদ জাতীয় সংসদে আইন প্রণেতারা 'ধর্ষণের শাস্তি ক্রসফায়ার' বলে অবিশ্বাস্য আওয়াজ তোলেন, তখন কি বিচারের আগে মৃত্যুদণ্ড বোঝায় না?
ক্ষেত্রবিস্তার করতে করতে ঘোরতর সন্ত্রাসীদের স্থলে ক্রমে আইন প্রয়োগে আইনি প্রক্রিয়ার শিথিলতা পরীমণির মাদক মামলার মতো ঘটনায় চলে এসেছে। অতঃপর সাংবাদিক। এবং এ-রকম সুযোগ দেওয়া হলে পুলিশ, আমলা প্রভৃতি সংস্থায় থাকা স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের লোকেরা ক্রমশ বেপরোয়া হয়েই উঠবে।
সাংবাদিকদের কারও সম্পদের হিসাব চাওয়া এবং সে জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট অবশ্যই তলব করা যাবে। সাংবাদিকরা কেউ অবৈধ বা অনুপার্জিত সম্পদ অর্জন করেননি বা সবাই ধোয়া তুলসিপাতা বা আইনের ঊর্ধ্বে থাকবেন এমন কেউ দাবি করছে না। অবশ্যই সাংবাদিক নেতাদের মধ্যে, বিশেষত ক্ষমতাসীন থাকা রাজনৈতিক দলের স্তাবকতা ও লেজুড়বৃত্তি করেন যারা তাদের মধ্যে কেউ কেউ বৈধ উপার্জনের বহু গুণ বেশি সম্পদের অধিকারী বলে জনমনে সন্দেহ ও গুঞ্জন রয়েছে। ঢাকায় থাকা নেতারাই শুধু নন, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের অনেককে মানুষ সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সন্দেহজনক চরিত্রের ব্যবসায়ী প্রভৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দেখতে পায়। এই ঘনিষ্ঠতা সংবাদ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার চেয়েও অতিরিক্ত মাখামাখি। এরকম সাংবাদিকের জীবনযাপনে ব্যয় ও সম্পদ নিয়েও গুঞ্জন অনেক জায়গায় রয়েছে। আরও বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে দুর্নীতি যে সমাজে আছে, সেখানে সাংবাদিকদের সম্পূর্ণ মুক্ত থাকার কথা নয়। অধিকন্তু সাংবাদিকরা ছড়ি ঘোরানোর মতো সরকারি ক্ষমতার অধিকারী না হয়েও শুধু পেশাগত কারণেই যখন কিছুটা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা ভোগ করেন, তখন পদস্খলন হতেই পারে।
কাজেই ব্যক্তির দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চয়ই নিতে হবে। তবে তা অবশ্যই আইনের আওতায়, আইনি প্রক্রিয়ায় এবং সংবিধানসম্মত ব্যক্তির ও পরিবারের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে এবং বিচারের আগে সম্মানহানি না ঘটিয়ে। সংবিধান অনুসারে সরকারের নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সকল ক্ষমতাই আইন মোতাবেক প্রযুক্ত হবে। আইনি ও ন্যায্য প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকলে আইনি কর্তৃপক্ষেরই ভেতরের-বাইরের কেউ স্বার্থ হাসিল বা গোপন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক নিশানা করে চক্রান্ত করতে পারে। আবার এই প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীনরাও মিডিয়াকে ভয় দেখিয়ে পদানত রাখার চেষ্টা করতে পারে। ১১ জন সাংবাদিক নেতাকে এক পাল্লায় তুলে এ রকম ব্যবস্থা নেওয়ার কারণে এসব সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। করোনা মহামারির সময় দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর সংবাদ প্রকাশ করার পটভূমিতে রোজিনা ইসলাম নামে একজন সাংবাদিককে সংবাদ সংগ্রহের সময় সচিবালয়ে হেনস্তা করা হলে সাংবাদিক নেতারা দল-গ্রুপ নির্বিশেষে জোর প্রতিবাদী হয়েছিলেন। তাতে আমলাদের একাংশের ক্ষুব্ধতা গোপন থাকেনি। এই সবকিছুই মানুষের জল্পনা-কল্পনায় রয়েছে।
বিস্ময়করভাবে এগারো সাংবাদিক হলেন সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই গ্রুপের ঢাকা ও ফেডারেল নিয়ে চার কমিটি এবং প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শীর্ষ নেতা। এদের কারও সম্পর্কে যদি বৈধ আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও কর ফাঁকির অভিযোগ থাকে, তাহলে দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব বিভাগের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিষ্পত্তির উপায় আছে। যদি অর্থ পাচার ও জঙ্গি অর্থায়নের প্রাথমিক বিশ্বাসযোগ্য সন্দেহের উপাদান হাতে আসে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক হিসাব তলব, আটক করতে পারে। কিন্তু সংগঠনের নামোল্লেখ করে সব নেতার বিরুদ্ধে ঢালাও পদক্ষেপ নিয়ে তাদের সামাজিক সম্মানহানি ও সাংবাদিক সমাজের ওপর ভিত্তিহীন কলঙ্ক আরোপ করে চাপ সৃষ্টি কেন? এ জন্যই সাংবাদিকরা এই ঢালাও আদেশ প্রত্যাহার ও আদেশ প্রদানকারীদের ক্ষমা প্রার্থনা দাবি করেছেন। প্রত্যাহারের পরেও উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক নেতা হিসেবে নয়, ব্যক্তি হিসেবে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবু এগারোজন নেতা ও সাংবাদিক-পেশাজীবীদের সমষ্টিগতভাবে অপমান করার প্রতিকার কী হবে, কারও কি কোনো শাস্তি হবে- সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক