দীর্ঘ আন্দোলনের পর খুলনার ময়ূর নদ দখলমুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া উচ্ছেদ অভিযান চলে ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওই চার মাসে প্রায় ৩৮২টি ছোট-বড় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। গত দুই বছরে নদ দখল করে নতুন কোনো স্থাপনা গড়ে ওঠেনি। তবে যেসব অংশ ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছিল, সেগুলো খননও হয়নি। ফলে নদ দখলমুক্ত করার সঙ্গে প্রাণ ফিরিয়ে আনার যে দাবি উঠেছিল, তা অধরাই রয়ে গেছে।

নদ দখলমুক্ত করতে নানা কার্যক্রম চললেও দূষণমুক্ত করার বিষয়ে কোনো তৎপরতা নেই। বছর খানেক আগে থেকেই এই নদে জলজপ্রাণী বেঁচে থাকার মতো দ্রবীভূত অক্সিজেন (ডিও) নেই। নগরীর বিভিন্ন এলাকার ২০টিরও বেশি নালার বর্জ্য নদে এসে পড়ছে। এতে পানির রং হয়েছে কুচকুচে কালো। কচুরিপানায় পরিপূর্ণ নদ দেখে বোঝার উপায় নেই, ৫০ বছর আগে এখানে বড় নৌযান চলাচল করত।

নদের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, গত এক সপ্তাহে বৃষ্টির কারণে নদে পানি বেড়েছে। বৃষ্টির পানি বাড়ায় দুর্গন্ধ কিছুটা কমেছে। নদের পুরোটাই কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। যেখানে কচুরিপানা নেই, সেখানে ভেসে আছে ময়লা-আবর্জনা।

নগরীর গল্লামারী এলাকায় ময়ূর নদের ওপর সড়ক বিভাগ যে সেতু নির্মাণ করেছে, এটিও নদের গলা চেপে ধরেছে। পানির মাত্র চার-পাঁচ ফুট ওপরে সেতু নির্মাণ করায় ওই অংশ দিয়ে নৌযান চলাচলের অবস্থা নেই।

কেসিসি থেকে জানা গেছে, ময়ূর নদের অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি করতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন, কেসিসি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কেডিএ ও ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে তিন মাস জরিপ করে ময়ূর নদ ও সংলগ্ন ২৬টি খাল দখল করে নির্মাণ করা ৩৮২টি স্থাপনার তালিকা চূড়ান্ত করে। ৪৬০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব স্থাপনা এবং নদের জমি দখল করে রেখেছেন।

সূত্রটি জানায়, ২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। ডিসেম্বর মাসের মধ্যে একাধিক বহুতল ভবনসহ সব স্থাপনা উচ্ছেদ করে কেসিসি। নদ দখল উচ্ছেদ কমিটির সদস্য সচিব ও কেসিসির বৈষয়িক কর্মকর্তা নুরুজ্জামান তালুকদার বলেন, প্রতি সপ্তাহে আমাদের লোকজন ময়ূর নদ পরিদর্শন করে। কেউ দখলের চেষ্টা চালালে উচ্ছেদ এবং থানায় ধরে আনা হয়। গত দেড় বছরে নতুন করে কেউ নদ দখল করেনি। কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ময়ূর নদসহ কয়েকটি খাল পুনরায় খনন করা হবে। আগামী বছর এই কাজ শুরু হবে।

সরেজমিন ঘুরে ও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকার ছোট-বড় ২০টি ড্রেন সরাসরি ময়ূর নদে এসে পড়েছে। প্রতিনিয়ত এসব ড্রেনের মাধ্যমে নগরীর ভেতরের সব বর্জ্য সরাসরি নদে এসে পড়ছে। এর পাশাপাশি নগরীর গল্লামারী এলাকার কসাইখানা, বাজারের বর্জ্য, তীরের বিভিন্ন খামারের বর্জ্য সরাসরি নদে পড়ছে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ময়ূর নদের পানির মান উন্নয়নে একটি সুপারিশ করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা কার্যালয়। কার্যালয়ের তৎকালীন পরিচালক অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠান। তাতে উল্লেখ করা হয়, ময়ূর নদের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মান নিচে নেমে যাওয়ার পেছনে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দায়ী।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, পানিতে ডিওর মাত্রা প্রতি লিটারে ৬ মিলিগ্রামের নিচে নেমে গেলে ছোট মাছ বাঁচে না। ময়ূর নদে বছরের বেশিরভাগ সময়ই ডিও শূন্যের কোঠায় থাকে।

বিষয় : খুলনার ময়ূর

মন্তব্য করুন