'সুরমা নদীর তীরে আমার ঠিকানা রে/ বাবা শাহজালালর দেশ/ সিলট ভূমি রে ...।' প্রখ্যাত সুরকার বিদিত লাল দাসের সুরে গীতিকার একে আনামের কথায় পুণ্যভূমি সিলেটের সার্বিক চিত্র ফুটে ওঠে। এ অঞ্চলের প্রকৃতি-পরিবেশের প্রাণ, হজরত শাহজালালের স্মৃতিবিজড়িত সুরমা নদী। তবে ক্রমাগত দখল ও দূষণের পাশাপাশি নাব্য সংকটে ভালো নেই বৃহত্তর সিলেটের প্রাণ। দীর্ঘ ২৪৯ কিলোমিটারের স্রোতধারার সুরমা শীত মৌসুমে প্রায় মরা গাঙে পরিণত হয়। নদীর বুকে বিশাল চর জেগে নদীপথ ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। অনেক জায়গায় নদীতীর ফসলের মাঠ হয়ে ওঠে। আবার বর্ষায় পানিপ্রবাহ বাড়লেও নাব্য সংকটে তা বন্যার কারণ হয়ে ওঠে। তখন তীরের মানুষের দুর্ভোগের নাম হয়ে ওঠে সুরমা। এই নদী রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

ভারতের মণিপুর রাজ্যের পাহাড়ের মাও সংসাং থেকে বরাক নদীর উৎপত্তি। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত হয়ে বরাক বাংলাদেশে প্রবেশের সময় সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জের অমলসিদে দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারা নাম ধারণ করে। মূলধারা সুরমা সিলেট ও সুনামগঞ্জ হয়ে আবার কুশিয়ারার সঙ্গে মিশে কিশোরগঞ্জে গিয়ে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। ২০১৯ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী সুরমা নদীর বিভিন্ন জায়গায় দুই হাজার ৪৪ দখলদার রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ৫৭৬ দখলদারকে উচ্ছেদ করা হলেও বাকিরা বহাল তবিয়তে রয়েছে। প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় স্থানীয় প্রশাসন তাদের উচ্ছেদ করতে পারছে না। রিভারাইন পিপলের হিসাবে সিলেট, ছাতক ও সুনামগঞ্জে সুরমা নদীতে সবচেয়ে বেশি দখলদার রয়েছে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নদীকে 'জীবন্ত সত্তা' হিসেবে আখ্যায়িত করে নদী দখল বা দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মতামত দেন। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চের মতামতের পরও সুরমা নদী দখল বা দূষণ রোধের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সিলেট নগরীর কাজিরবাজার এলাকায় নদীর তীর ও কূলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বাসাবাড়িও গড়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে সিলেট সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ অভিযানে নগরীর কাজিরবাজার এলাকায় নদীতীরের শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। গতকাল শনিবার সরেজমিন দেখা  গেছে, কাজিরবাজারে নদীতীরে অনেক কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি রয়েছে। এসবের বর্জ্য সুরমাকে দূষিত করছে।

নগরীর মতো সীমান্তবর্তী উপজেলা কানাইঘাট ও সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা নদীর তীর দখলদাররা বহাল রয়েছে। কানাইঘাট পৌর শহরের পূর্ব থেকে দক্ষিণ বাজার পর্যন্ত নদীর তীর ও কূল দখল করে শতাধিক স্থাপনা রয়েছে। এসবের মধ্যে ওয়ার্কশপ, কারখানা, রেস্টুরেন্ট ও আবাসিক হোটেল রয়েছে। আবার কিছু বাসাবাড়িও রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। একইভাবে সুনামগঞ্জের ছাতকে সুরমা নদীর তীর দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়নি। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি যতটুকু প্লাবিত করে, তার থেকে আরও ৫০ মিটার পর্যন্ত নদীর সীমানা বলে বিবেচিত হবে। তবে নগরায়ণ ও আবাসনের জন্য অনেক ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয় না।

পাহাড়ি নদী হওয়ায় বরাক হয়ে বিপুল পরিমাণ বালু-পাথর নেমে আসে। এতে সুরমার নাব্য সংকট ত্বরান্বিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে খনন না করায় পানি প্রবাহ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নদীবিধৌত জনজীবনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। আবদুল করিম কিম বলেন, বরাকের মোহনায় অমলসিদে বিশাল চর হয়ে সেখানে ইউটার্নের সৃষ্টি হয়েছে। এতে শুস্ক মৌসুমে সুরমা মাতৃনদী বরাক থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর কূলে সবজি চাষও হয়।

সেভ দ্য হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের সমন্বয়ক আবদুল হাই আল-হাদী সুরমার নাব্য সংকটের জন্য অমলসিদে জেগে ওঠা বিশাল চরকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে সুরমার পানি প্রবাহের মূল ভরসা লোভাছড়া নদী। কিন্তু অপরিকল্পিত পাথর উত্তোলন, দখলসহ নানা কারণে লোভাছড়ার স্বাভাবিক প্রবাহেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, সুরমার নাব্য সংকট নিরসনের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কাছে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি।

নগরীর জলাবদ্ধতার জন্য সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) সুরমা নদীর নাব্য সংকটকে সামনে আনে। এ প্রসঙ্গে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, নদীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সবক'টি ছড়া-খাল ও ড্রেন নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিস্কার করার ফলে ৫০-৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন হয়েছে। এসবের পানি সুরমা নদীতে পতিত হয়। কিন্তু বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির ফলে সুরমা উপচে পড়লে নগরীর পানি অপসারিত হতে পারে না। নগরীর কাজিরবাজার ও ঝালোপাড়া এলাকায় নদীর তীর দখলের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, উচ্ছেদের ক্ষেত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুরমার পানি দূষণের জন্য সচেতনতার অভাবকে দায়ী করেন সিসিকের এই প্রকৌশলী। তিনি বলেন, নদীতীরের বাসাবাড়ি ও বিসিক শিল্পনগরীর প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি তাদের বর্জ্য নদীতে ফেলে পানি দূষিত করছে।

বছরজুড়ে নৌপথ রক্ষায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সুরমা নদীর ১২৫ কিলোমিটার খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে নৌপথ রক্ষা হলেও পানি প্রবাহের ক্ষেত্রে শতভাগ কার্যকর হবে না বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। এ প্রসঙ্গে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, বিআইডব্লিউটিএ সুরমা নদী খনন করবে। তাই পাউবো নদী খননের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে। একই নদীতে দুটি প্রতিষ্ঠানের খননের সুযোগ নেই। বিআইডব্লিউটিএর খননে সুরমায় নৌপথের বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও অমলসিদের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করবে বলে জানান পাউবোর এই কর্মকর্তা। এদিকে দখলদার উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আগ্রহী ঠিকাদার মিলছে না বলে জানিয়েছেন আসিফ আহমেদ। তিনি বলেন, পাঁচবার টেন্ডার আহ্বান করলেও ঠিকাদার মেলেনি। আরেক দফা টেন্ডার আহ্বানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।