সাধারণত কোনো দেশের অর্থনীতিতে তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকা আবশ্যক। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, যা দিয়ে ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। কভিড-১৯ এর সময়ে যেখানে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার কমে গেছে এবং অনেক কর্মী কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, এমন অবস্থায় বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অবশ্য গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের তথ্য অনুযায়ী, কভিড-১৯-এর সময় রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বগতির বদলে এখন এই ধারা ক্রমশ নিম্নগামী।
২০২০ সালে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসে ভারতে। যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরপরেই রয়েছে চীন, মেক্সিকো, ফিলিপাইন, মিসর, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অবস্থান। ২০১৯ সালে প্রবাসী আয় আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম ছিল কিন্তু ২০২০ সালে করোনা মহামারি চলাকালীন বাংলাদেশের অবস্থানের এক ধাপ উন্নতি হয়ে সপ্তম স্থানে পৌঁছে। করোনার মধ্যেও গত বছর বাংলাদেশে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় আসে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির নিরিখে যা ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রবাসী আয় আসার হার প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
করোনা মহামারির সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে খাবি খাচ্ছে, সেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বরং স্বস্তি দিয়েছে প্রবাসী আয়। গত ১৩ জুলাই বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, করোনার মধ্যে ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বাংলাদেশে বৈধ পথে প্রবাসী আয় পাঠানো বেড়েছে। কভিড-১৯-এর সময়ে বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে দেশে থাকা কর্মক্ষম ব্যক্তি কাজ হারিয়েছে। ফলে প্রবাসে থাকা তাদের প্রিয়জন সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের সঞ্চয়ের বড় অংশ দেশে পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে নগদ, রকেট, বিকাশের মতো নতুন নতুন মানি ট্রান্সফার পদ্ধতির উদ্ভাবন ঘটায় সহজে এবং নিয়মিত প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠালে ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করায় বাংলাদেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। তাছাড়া প্রকৃত অর্থেই দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, নাকি বৈধ পথে রেমিট্যান্স আসা বেড়ে যাওয়ায় কাগজে-কলমে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বেড়েছে তা নির্ণয় করতে আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ধরে রাখা বাংলাদেশ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। করোনাকালীন যেভাবে প্রবাসীরা কর্ম হারিয়ে দেশে ফিরে আসছেন এবং নতুন কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা সংকট দৃশ্যমান তাতে অদূর ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখাটা সহজ হবে না। সেক্ষেত্রে বিদেশে নতুন জনশক্তি পাঠানোর ক্ষেত্রে কর্মীদের দক্ষতা বাড়াতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকার ২০১৯ সাল থেকে যে প্রণোদনা চালু করেছে তা আরও কিছু দিন চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বাড়লেও সেটি কী খাতে ব্যয় হচ্ছে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বাংলাদেশে যে প্রবাসী আয় আসে তার প্রায় সবটুকুই ভোগ ব্যয়ে খরচ হয়। প্রবাসী আয়ের এই অর্থ ভোগ ব্যয়ে খরচ হওয়া দোষের কিছু না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই অর্থ আয় করলে প্রথমে ভোগ ব্যয়ে তা খরচ করে উন্নত জীবনযাপনের চেষ্টা করে। তাই আমাদের দেশের প্রবাসীবহুল এলাকায় নজর দিলে দেখা যায় সেসব জায়গার মানুষ ভালো খাবার খাচ্ছেন, ভালো বাড়িতে থাকছেন। ভোগ ব্যয়ে বাজারে অর্থের লেনদেন বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক্স পণ্যের যে বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে, তার পেছনে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। যদিও প্রবাসীদের পরিবার প্রবাসী আয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত জীবনযাপন করছে কিন্তু অর্থনীতিতে শুধু এগুলোই উন্নয়নের ইন্ডিকেটর নয়। বরং তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা গেলে, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে এবং প্রকৃত অর্থে যদি উন্নত জীবনের স্বাদ দেওয়া যায় সেটিই সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। কিন্তু প্রবাসীদের সন্তানদের উন্নত শিক্ষা প্রদানের পেছনে এই আয়ের কতটা ব্যয় হচ্ছে তা নিরূপিত নয়। এজন্য দেখা যায় প্রবাসী কর্মীদের পরবর্তী প্রজন্ম কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যরাও একইভাবে তুলনামূলক আন-স্কিলড ওয়ার্কার হিসেবে আবারও প্রবাসে যাচ্ছে। ফলে পরিবারের প্রবাসী সদস্যের ত্যাগ স্বীকারের পূর্ণ সুফল তারা ভোগ করতে পারছে না।
প্রবাসী আয় যদি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ করা যায় সেক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতির আকার যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি প্রচুর নতুন মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। সেই বিবেচনায় বর্তমানে প্রবাসীদের বিনিয়োগের জন্য এক বা একাধিক আলাদা ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রবাসীদের অর্থ বিনিয়োগের জন্য টেকবান্ধব বিনিয়োগ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও জোর দেওয়া জরুরি। কেননা তারা যদি দেশে নিরাপদ বোধ করেন সেক্ষেত্রেই কেবল বিনিয়োগে আস্থা পাবেন।
রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায় প্রবাসীদের উন্নয়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীদের বিদেশ যাত্রা ও দেশে প্রস্থানের সময় সম্মানের সঙ্গে দেখভাল নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে তাদের অর্থ বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ ক্ষেত্র সৃষ্টি করা অবশ্য কর্তব্য। আমরা আশা করি, সময়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় যেমন বাড়বে, তেমনি এই অর্থ বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। তবেই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিকাশ আরও গতি পাবে।
শিক্ষার্থী, নোভা স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিক্স, পর্তুগাল
kaisulkhan@yahoo.com