চট্টগ্রাম শহরে ১০ পুকুর দখলকারীর পেটে চলে গেছে রেলওয়ের ৫০ কোটি টাকার সম্পদ। মাছ চাষের জন্য নামমাত্র টাকায় পুকুর লিজ নিয়ে আস্ত পুকুর ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে মার্কেট। তৈরি করা মার্কেটের দোকান ও কারখানা ভাড়া দিয়ে অবৈধভাবে আয় করেছেন কয়েক কোটি টাকা। ২০১৪ সালে রেলওয়ে লিজ বরাদ্দ ও লাইসেন্স বাতিল করলেও অবৈধ মার্কেটটি দখলে রেখে বাণিজ্য করে যাচ্ছেন তারা। রেলওয়ের সম্পদ নয়ছয়ের তদন্তে নামে দুদক। দুদকের তদন্তে মাছ চাষ করার জন্য পুকুর লিজ নিয়ে শর্ত ভঙ্গ ও কারসাজি করায় পুকুর ইজারাদারসহ ১০ ব্যবসায়ী ফেঁসে গেছেন দুর্নীতির মামলায়।

দুদক চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ফখরুল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের পুকুর মাছ চাষের জন্য লিজ নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করে মাটি দিয়ে পুকুরটি ভরাট করে তাতে মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। লিজ বাতিল করার পরও রেলওয়ের সম্পত্তি দখলে রেখে অবৈধভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যাচ্ছেন অভিযুক্তরা। সরকারি সম্পদ আত্মসাতের ঘটনায় লিজ নিয়ে দখলে রাখা মীর মোয়াজ্জেমসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছি।

অভিযুক্ত ইজারাদার মীর মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, রেলওয়ে কিছু শর্ত ভঙ্গ করায় মার্কেট নির্মাণ করেছি। এ জন্য আমার লাইসেন্স বাতিল করেছে রেলওয়ে। আমি কোনো অন্যায় করিনি। আইনের মধ্যেই সবকিছু করেছি। দুদকের মামলায় আদালতে আইনিভাবে লড়ব।

অভিযুক্ত আল আজিজিয়া ইলেকট্রিক ওয়ার্কশপ ও সোহা মেডিসিন পয়েন্টের মালিক মো. জাহেদ বলেন, মোয়াজ্জেমের কাছ থেকে অগ্রিম চার লাখ ও মাসে ছয় হাজার টাকার বিনিময়ে মার্কেটে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছি। আমাদের দোষ কোথায়? আমাদের কেন আসামি করা হলো।

জমি রেলের, বাণিজ্য করছেন মোয়াজ্জেম: দুদকের তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১০ সালের ২৫ অক্টোবর মাছ চাষের জন্য একসঙ্গে একাধিক পুকুর ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করে বাংলাদেশ রেলওয়ের এস্টেট বিভাগ। ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর নগরীর বিবিরহাট এলাকায় দশমিক ২৮ একর ভূমির লিজ বরাদ্দ পান কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলার টনিভাঙ্গা গ্রামের মীর মো. জাকেরের ছেলে মীর মোয়াজ্জেম হোসেন। ২৬ ডিসেম্বর তাকে বিশাল পুকুরটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। অস্থায়ী ভিত্তিতে পাঁচ বছরের জন্য পুকুরটি শুধু মাছ চাষের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। দরপত্রের ১৪ নম্বর শর্তে বলা হয়, পুকুরটি মাছ চাষ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। পুকুরটি ১০ লাখ টাকায় লিজ নিয়েছেন ইজারাদার মোয়াজ্জেম। লিজ নিয়েই তিনি কয়েক মাসের মধ্যে মাটি ফেলে ভরাট করে তৈরি করেন কারখানা ও মার্কেট। পুকুরের জায়গাটি বানিয়ে ফেলেন বাণিজ্য কেন্দ্র।

লিজ বাতিলের পরও দখল ছাড়েননি তারা: দুদকের তদন্তে উঠে আসে, লিজ বাতিল হওয়ার পরও আট বছর ধরে অবৈধভাবে রেলওয়ের মূল্যবান জায়গাটি দখলে রেখেছেন মীর মোয়াজ্জেম হোসেনরা। পুকুর ভরাটের অভিযোগে রেলওয়ের আমিন নাসির উদ্দিন মোল্লা ও কানুনগো আবুল খায়ের ২০১৩ সালের ১৭ এপ্রিল পুকুর মাটি দিয়ে ভরাট করে মার্কেট তৈরি করার প্রমাণ পেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তার আলোকে রেলওয়ে থেকে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট লিজ বরাদ্দ নেওয়া মোয়াজ্জেমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ইজারাদারের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লিজ চুক্তি বাতিল করে রেলওয়ে। একই সঙ্গে ইজারাদারের তৈরি করা অবৈধ মার্কেট ও স্থাপনা উচ্ছেদে ৩ এপ্রিল নোটিশ জারি করে। উচ্ছেদ নোটিশ পাওয়ার পর ইজারাদার হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন। পরে সেই রিট পিটিশনও খারিজ হয়ে যায়। তারপরও রেলের জমি মোয়াজ্জেম অবৈধভাবে দখলে রেখে দেন। সরেজমিন গিয়ে পুকুরের জায়গায় মোয়াজ্জেমের তৈরি করা মার্কেট ও স্থাপনা এখনও বহাল তবিয়তে থাকতে দেখা গেছে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাও পুকুর ভরাট করে মার্কেট বানিয়ে অবৈধ বাণিজ্য করার সত্যতা পেয়েছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

রেলের জমি লিজ নিয়েই মালিক বনে ফাঁসলেন যারা: পুকুর ও জায়গা রেলওয়ের। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে মালিক বনে যান তারা। আর এতেই হয়েছে বিধিবাম। দুদকের তদন্তে ফেঁসে যান। হন দুর্নীতি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। রেলওয়ের জমির মালিক বনে যাওয়া দুর্নীতি মামলার আসামিরা হলেন- ইজারাদার মীর মোয়াজ্জেম হোসেন, অবৈধ দখলদার মো. জাহেদ, রনজিত কুমার দাশ, সুজিত দে, শামসুল আলম, মাহফুজুর রহমান, এনামুল হক সুমন, মেহাম্মদ মিজানুর রহমান, শহীদুল ইসলাম ও আমির হোসেন। তাদের মধ্যে জাহেদ আল আজিজিয়া ইলেকট্রিক ওয়ার্কশপ ও সোহা মেডিসিন পয়েন্টের মালিক, রনজিত জয় মোটর্সের মালিক, সুজিত খাজা অটো পার্টসের মালিক, শামসুল মা-বাবা ইলেকট্রিকের মালিক, মাহফুজুর এম রহমান মেডিসিন হাউসের মালিক, সুমন চৌধুরী টেইলার্স ও চৌধুরী স্টোরের মালিক, মিজানুর তালুকদার স্টোরের মালিক, শহীদুল শাহ আমানত শালকরের মালিক।

১০ লাখ টাকায় লিজ নিয়ে কোটি টাকার বাণিজ্য: ভরাট করা পুকুরটি মাছ চাষের জন্য লিজ দিতে সরকারি দর নির্ধারণ করা হয় আট হাজার ৪০০ টাকা। ইজারা পেতে মীর মোয়াজ্জেম হোসেন দর হাঁকেন ১০ লাখ ৫০০ টাকা। যদিও এর আগে মো. জাহাঙ্গীর নামের অন্য এক ইজারাদার এ একই পুকুর ইজারা নিয়েছিলেন মাত্র ২৫ হাজার টাকায়। পুকুরটি লিজ নিয়েই মোয়াজ্জেম কারসাজির আশ্রয় নেন। মাছ চাষের নামে ইজারা নিয়ে পুকুর ভরাট করে নির্মাণ করেন মার্কেট। হজরত ছৈয়দ সলিমুলল্গাহ শাহ নামে মার্কেটে ২৩টি দোকান ভাড়া দিয়ে এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা অগ্রিম এবং মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে মাসিক ভাড়া দেওয়া হয়েছে মার্কেটের প্রতিটি দোকান। ২৩ দোকানের দুটি টেইলার্স, তিনটি মুদিদোকান, একটি ফার্মেসি, একটি টিভি-ফ্রিজের সার্ভিসিং সেন্টার ও একটি হার্ডওয়্যারের দোকান রয়েছে। এর বাইরে আছে গাড়ির পার্টসের গুদামও। একটি দ্বিতল কারখানা মধুবন নামে কনফেকশনারির শ্রমিকদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।