কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে রিকশা-অটোরিকশা বা অন্য কোনো যানে করে স্টেশন সড়ক দিয়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় শত শত যাত্রী তাদের বাসাবাড়িতে যান। মাত্র এক দশক আগেও স্টেশনে নামার পর রেলের পুরোনো গোডাউন সংলগ্ন পশ্চিম-উত্তর দিকে যাত্রীদের চোখে পড়ত চোখ জুড়ানো রেলওয়ের বিশাল পুকুর। অনেকেই বিশাল পুকুরটিকে ঝিল বলে ভুল করতেন। স্টেশনের প্রধান সড়কের পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সেই আকর্ষণীয় পুকুরটি কয়েক বছর আগেও সড়ক থেকে দেখা যেত। এখন আর সেই পুকুর দেখা যায় না।
পুকুরপাড়ের ভূমি ইজারার নামে দখল করে নিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। রেলের ভূমি অধিগ্রহণ বিভাগের একশ্রেণির অসৎ কর্মকতা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব ভূমি নামমাত্র অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিয়ে প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছেন। পরে পুকুরসহ স্টেশন সড়কের পাশে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা।
দোকানপাট নির্মাণ ও ভরাটের কারণে রেলের এই শতাব্দীপ্রাচীন পুকুরটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার পথে। কয়েক একরের পুকুরটি ভরাট হয়ে ছোট হচ্ছে। পুকুরের বাম পাশের শতাধিক পরিবারের লোকজন জানান, পুকুরটি ঘিরে দোকানপাট হওয়ায় তারা আগের মতো আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত।
পুকুরটির মূল ইজারাদার সায়েম তালুকদারকে একাধিকবার মোবাইল ফোনে ও লোকজনের মাধ্যমে খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমান দখলদার রাজিবুজ্জামান হিমেল বলেন, স্ট্যাম্পে লিখে তিনি মূল ইজারাদারের কাছ থেকে পুকুরটি সাবলিজ নিয়েছেন। বর্তমানে পুকুরটিতে তিনি মাছ চাষ করছেন। তিনি বলেন, আমি পুকুরটি দখলে না নিলে প্রভাবশালীরা পুকুরটি ভরাট করে তাদের দখলদারিত্ব কায়েম করত। এরপরও কৌশল করে মাসে মাসে ভরাট করায় ৩০০ শতাংশের পুকুরটি বর্তমানে ২০৪ শতাংশে ছোট হয়ে এসেছে। জনগণের বা রেলের প্রয়োজনে যদি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে জনস্বার্থে তিনি পুকুরের দখল ছেড়ে দেবেন বলে জানান।
সরেজমিন কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, রেলস্টেশনের উত্তরে একরামপুর মোড় থেকে দক্ষিণে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় রেলওয়ের প্রায় ৭০ একর ভূমি ইজারার নামে দখল হয়ে গেছে। এ ভূমির আনুমানিক মূল্য হাজার কোটি টাকা। এমনকি রেলের ভূমিতে স্থায়ীভাবে মার্কেট গড়ে ভাড়া দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। বিনিময়ে রেলের কতিপয় কর্মকর্তা মাসিক বা বছরভিত্তিক পরিদর্শনে এসে পকেট ভারী করে চলে যান বলে রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়।
কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, এসব কাজে তার শাখার কোনো হাত নেই। স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হাঁটলে সবকিছুই তো চোখে পড়ে। এসব দেখে খুব খারাপ লাগে। লিজের বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে না। রেলওয়েতে দীর্ঘদিন চাকরি করছি, তাই বিবেক আমাদেরও নাড়া দেয়।
কিশোরগঞ্জে কর্মরত রেলের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) কামরুজ্জামান খান বলেন, সবকিছু তো দেখতেই পাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে রেলপথ ঠিক রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
রেলের পূর্বাঞ্চল জোনের এস্টেট বিভাগের সার্ভেয়ার ফয়েজ মিয়া বলেন, দোকানপাট তৈরির কারণে বড় পুকুরটি চোখে পড়ে না। কিশোরগঞ্জে রেলের হাজার কোটি টাকার জমি রয়েছে- এ কথার সঙ্গে একমত প্রকাশ করে তিনি জানান, ভূমির সবটুকু ইজারা দেওয়া হয়নি। কোনো কোনো ভূমি প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। সরকার রেলের ভূমি থেকে সঠিক পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছেন না বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।
পুকুরপাড় ও রেলের ভূমিতে ঘর তৈরি করেছেন তারাপাশা এলাকার খোকন মিয়া, আবদুল আজিজ, আলামিন, রফিক মিয়াসহ অন্তত ১০-১২ জন। তারা জানান, ঢাকা এস্টেট বিভাগ থেকে ইজারা নিয়ে তারা দোকানঘর করেছেন। তারা প্রতি বছর নির্ধারিত হারে রেলকে রাজস্ব দিচ্ছেন বলেও দাবি করেন। প্রতি বছর কত টাকা দেন, তা জানাতে তারা অপারগতা প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী জানান, তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকায় রেলের ভূমির একটি দোকান অন্যের কাছ থেকে কিনে ব্যবসা করছেন। স্টেশন সড়কের সেকান্দার আলী জানান, তিনি জমি ইজারা নিয়ে তিনটি দোকানঘর তৈরি করেছেন। তিনটি দোকানঘরই তিনি ভাড়া দিয়েছেন। রেলের এস্টেট বিভাগকে তিনি প্রতি বছর ইজারা বাবদ অর্থও পরিশোধ করছেন বলে জানান।
পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ রবীন্দ্রনাথ চৌধুরী বলেন, রেলস্টেশনের ভূমি ইজারা বা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে তারা এলাকার সৌন্দর্য মাথায় রাখেন না। সব ভূমিই ইজারা দিয়ে এক মহাসংকট তৈরি করেন। উচ্ছেদ করে এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থান আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।



বিষয় : রেলের ভূমি দখল করে মার্কেট

মন্তব্য করুন