ধর্ষণের মতো শাস্তিযোগ্য জনগুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো বছরের পর বছর আদালতে বিচারাধীন থাকছে। অথচ আইনেই ধর্ষণের ঘটনায় করা মামলাগুলোর বিচারের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ১৮০ দিন। এরই আলোকে ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই সাত দফা নির্দেশনাসহ হাইকোর্টের এক রায়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের মুলতবি ছাড়াই ধর্ষণ মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হাইকোর্টের এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকেও গত বছরের ডিসেম্বরে সংশ্নিষ্ট বিচারকদের উদ্দেশে জারি করা হয়েছে পৃথক বিজ্ঞপ্তি। কিন্তু ধর্ষণ মামলার বিচারে হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো এখনও উপেক্ষিত হচ্ছে।
রায়ের অন্য নির্দেশনায় রয়েছে- ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচারে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিতে মনিটরিং টিম গঠন, অফিসিয়াল সাক্ষীর গরহাজিরে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। এ ছাড়া রায়ে সংশ্নিষ্ট বিচারকদের প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্টে ধর্ষণ মামলা বিচার বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু রায়ের পর ২৭ মাস পার হলেও নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। অবশ্য সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে গত বছরের ২ ডিসেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে ধর্ষণ মামলার বিচারে হাইকোর্টে দেওয়া নির্দেশনাগুলো প্রতিপালনের জন্য বলা হয়েছে। তবে কয়েকটি আদালতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে হাইকোর্টের রায় প্রতিপালন হয়নি। সুপ্রিম কোর্টে প্রতি মাসে প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশনাও প্রতিপালন করেননি সংশ্নিষ্ট বিচারকরা। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকেও এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট বিচারকদের দেওয়া হয়নি অন্য কোনো নির্দেশনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. আলী আকবর সমকালকে বলেন, আমরা সার্কুলার দিয়েছিলাম। কেন এটি কার্যকর হয়নি, খোঁজ নিয়ে দেখব। প্রয়োজন হলে আবারও সংশ্নিষ্টদের সার্কুলারের বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া হবে।
অবশ্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের একাধিক বিচারক জানান, করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে অধস্তন আদালতে নিয়মিত বিচারকাজ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ ছিল। কিছু সময় ভার্চুয়াল মাধ্যমেও বিচারকাজ হয়েছে। কিন্তু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে ভার্চুয়াল মাধ্যমে ধর্ষণ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ সম্ভব ছিল না। এসব কারণে মুলতবি ছাড়াই ধর্ষণ মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। সব মিলিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ধর্ষণ মামলা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও তারা পাঠাতে পারেননি।
বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থায় জনবল ও কাঠামোগত নানা সংকটে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশ মামলাই নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন যথাযথভাবে কার্যকর করার লক্ষ্যে 'মো. রাহেল ওরফে রায়হান বনাম রাষ্ট্র' মামলার রায়ে সাত দফা নির্দেশনা দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
সাত দফা নির্দেশনায় বলা হয়- এক. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় বিচারাধীন ধর্ষণ এবং ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা মামলাগুলোর বিচার আইনে নির্ধারিত সময়সীমা, অর্থাৎ বিচারের জন্য মামলা পাওয়ার দিন থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করতে হবে।
দুই. শুনানি শুরু হলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে একটানা মামলা পরিচালনা করতে হবে।
তিন. মামলার ধার্য তারিখে সাক্ষীর উপস্থিতি ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি জেলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন), সিভিল সার্জনের একজন প্রতিনিধি ও সংশ্নিষ্ট ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউট কমিটির সমন্বয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে। ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর কমিটির সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবেন এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতি মাসে সুপ্রিম কোর্ট, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাবেন। কোনো জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল থাকলে সব ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটররা মনিটরিং কমিটিভুক্ত হবেন। এ ক্ষেত্রে যিনি জ্যেষ্ঠ, তিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন।
চার. ধার্য তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সংগত কারণ ছাড়া সাক্ষীকে আদালতে উপস্থিত করতে ব্যর্থ হলে মনিটরিং কমিটিকে জবাবদিহি করতে হবে।
পাঁচ. মনিটরিং কমিটি সাক্ষীদের ওপর দ্রুত সময়ে সমন জারির বিষয়টিও তদারকি করবে।
ছয়. ধার্য তারিখে সমন পাওয়ার পর অফিসিয়াল সাক্ষী, যেমন- ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, ডাক্তার বা অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সন্তোষজনক কারণ ছাড়া সাক্ষ্য প্রদানে উপস্থিত না হলে ট্রাইব্যুনাল ওই সাক্ষীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ এবং প্রয়োজনে বেতন বন্ধের আদেশ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
সাত. আদালতের অভিমত এই যে, ধর্ষণ বা ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলার ভিকটিম, তার পরিবার ও অন্যদের সুরক্ষায় অবিলম্বে সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
রায়ে বলা হয়, সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ দেশের অধস্তন সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর ওই বিভাগের (হাইকোর্ট) তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা থাকবে বলে উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ অনুসরণ করেই হাইকোর্ট এই সাত দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।
হাইকোর্টের রায়ে দেওয়া নির্দেশনার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'অবশ্যই এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যাতে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এ জন্য যে সমস্যাগুলো রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
এদিকে, ধর্ষণ মামলার দ্রুত বিচারে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনও বিভিন্ন সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচারকদের তাগিদ দিয়েছেন। সবশেষ গত ১৯ জুন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ইনকোয়ারি কমিটি আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান বিচারপতি বলেন, ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য হলেই ধর্ষককে শাস্তি দেওয়া যায়। এসব মামলার দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং নিষ্পত্তি করতে হবে।
সভায় দেশের ৬৪ জেলার জেলা ও দায়রা জজ, সব নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এবং চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
ধর্ষণ রোধ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'ধর্ষণের ঘটনা রোধে প্রয়োজন মানুষের মনমানসিকতার পরিবর্তন। আর সেটা সরকার ও সমাজ ব্যবস্থার উন্নতির ওপর নির্ভর করছে।' অপরাধীদের দ্রুত বিচার প্রসঙ্গে শাহ্‌দীন মালিক বলেন, 'ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দ্রুত বিচার এবং যথোপযুক্ত বিচার করতে হলে প্রসিকিউশন সেলকে ক্যাডার সার্ভিসে পরিণত করতে হবে। নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে হবে। অর্থাৎ বিচারকের সংখ্যা দ্বিগুণ করে অন্তত তিন হাজার ৬০০ করতে হবে। কারণ, ১৮ কোটি মানুষের দেশে এক হাজার আটশ বিচারক যথেষ্ট নয়। এ জন্য বিচার বিভাগের অধীনে বাজেটও বাড়াতে হবে।'
অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, 'সমাজের কিছু লোক গর্হিত এ অপরাধগুলো করছে। তাদের নিবৃত্ত ও অন্যদের নিরুৎসাহিত এবং ভয় দেখাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।' তিনি বলেন, শুধু শাস্তি দিয়ে ধর্ষণ রোধ করা সম্ভব নয়। অপরাধপ্রবণ মানসিকতার পরিবর্তনেও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, 'আইনের বিধান ও হাইকোর্টের নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়ন হলে ধর্ষণ মামলার আসামিরা কোনোভাবেই জামিন নিয়ে বেরোতে পারত না। বিচার বিলম্বের কারণেই এখন সেটা হচ্ছে। নয়তো তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতো, যা সমাজে অপরাধের প্রবণতা কমাতে কার্যকর ভূমিকাও রাখত।

বিষয় : ধর্ষণ মামলার বিচার

মন্তব্য করুন