ঈশ্বরদীতে একসময় যেসব প্রতিবন্ধী ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারা এখন কর্মমুখী। এদের কেউ গরু-ছাগল পালন করেন, কেউ ছোটখাটো দোকানদারি করেন, কেউ এই সমিতির মাধ্যমে সমাজসেবা অফিস থেকে বিনা সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন। এসব প্রতিবন্ধীর মধ্যে অনেকেই এখন ইপিজেডের কারখানা, রেলওয়ে কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এই অসম্ভবকে সম্ভব করছেন পাবনার ঈশ্বরদীর চররূপপুর জিগাতলা এলাকার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সানোয়ার হোসেন। দু'চোখে আলো নেই। কিন্তু তিনি ৫০ জনেরও বেশি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ ওই এলাকার ৭১৪ প্রতিবন্ধীকে দেখিয়েছেন আলোর পথ।

জানা গেছে, তিনি ২০০৪ সালে ঈশ্বরদীতে গড়ে তুলেছেন প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ৬০০ প্রতিবন্ধীকে সরকারি ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইপিজেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৩৫ জন চাকরি এবং ৪৬০ জন প্রতিবন্ধী স্বাবলম্বী হয়েছেন এই সমিতির মাধ্যমে।

এক সময় সানোয়ার চিন্তা করতেন কীভাবে প্রতিবন্ধীরা স্বাবলম্বী হবেন। এরই মধ্যে জিগাতলা এলাকায় সমিতির নিজস্ব জমিতে ভবন নির্মাণ করে সেখানে আধুনিক ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং কফি হাউস স্থাপন করা হয়েছে। তারাই কাজ করেন এখানে। প্রতিদিন ডিপার্টমেন্টাল স্টোর ও কফিশপে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। ঈশ্বরদী ইপিজেড, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের অনেক বিদেশি নাগরিক এখন প্রতিবন্ধীদের গড়া প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত গ্রাহক। প্রতিবন্ধীদের ভাগ্যোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকার জন্য প্রতিবন্ধী সানোয়ার হোসেন ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃতও হয়েছেন। এ ছাড়া পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।

সাহাপুরের বাসিন্দা বশির আহমেদ বকুল বলেন, প্রতিবন্ধীদের জন্য আমি সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে সানোয়ার হোসেন যা করে দেখিয়েছেন আমরা সুস্থ মানুষরাও তা করতে পারিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাহাপুর জিগাতলার বাসিন্দা মো. শিবলু হোসেন জানান, সানোয়ার হোসেনের কারণে এই এলাকার শত শত প্রতিবন্ধীসহ বহু প্রতিবন্ধী এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী আসাদুল হক বলেন, প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে আগে অভিশপ্ত জীবন ছিল আমার। এখন কৃষি কাজ করছি, ভালো আছি।

রুমি খাতুন নামে প্রতিবন্ধী নারী বলেন, আগে ভিক্ষা করে আহারের ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু সানোয়ার হোসেনের সহযোগিতা পেয়ে এখন বাড়িতে কয়েকটি গরু-ছাগল পালন করে স্বাচ্ছন্দ্যে চলে আমার সংসার।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সানোয়ার হক বলেন, আগে অন্যের সহযোগিতা নিয়ে চলতাম। সানোয়ার হোসেন ভাই আমাকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। এখন আমি কাজ করছি।

নতুন রূপপুরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তোহিদুল ইসলাম তনু বলেন, সমিতির মাধ্যমে বিনা সুদে ঋণ পেয়ে এখন ছোটখাটো দোকান দিয়ে ব্যবসা করছি।

প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন ও মানবাধিকার সমিতির সহসভাপতি কাকলী পারভীন চুমকি, সাধারণ সম্পাদক মো. মুক্তার হোসেনসহ অন্যরা জানান, সমিতির সভাপতি সানোয়ার হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই সমিতি এখন আদর্শ প্রতিষ্ঠানে রূপ লাভ করেছে। এই এলাকার প্রতিবন্ধীরা এখানে তাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে অনুভব করেন।

ইপিজেডের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. পরশ জানান, সানোয়ার ভাইয়ের অনুরোধে ইপিজেডের একাধিক প্রতিষ্ঠানে এখন প্রতিবন্ধীরা চাকরি করার সুযোগ পেয়েছেন।

পাকশী ইউপি চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাস বলেন, এই এলাকার প্রায় সব প্রতিবন্ধীর ভাগ্য পরিবর্তন করতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও সানোয়ার হোসেন যা করে চলেছেন তা এখন এলাকার জন্য দৃষ্টান্ত।

ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, সানোয়ার হোসেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও যেভাবে ভূমিকা রেখে চলেছেন তা সত্যিই অনন্য দৃষ্টান্ত।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সানোয়ার হোসেন জানান, মাত্র আড়াই বছর বয়সে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। ১৯৮৭ সালে মাত্র ৮-৯ বছর বয়সে পাকশী ফেরিঘাটে চকলেট, দাঁতের মাজন বিক্রি করলেও কখনও করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে চাননি।

তিনি বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে দেখতে না পারার কষ্ট আরও প্রবলভাবে অনুভব করেছি। সেই কষ্ট থেকে নিজের আয় থেকে প্রতিবন্ধীদের অল্প অল্প করে সহযোগিতা করতাম। জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমার মতো প্রতিবন্ধীদের যেন কারোর করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে না থাকতে হয়, সে লড়াই করে চলেছি।