চট্টগ্রামে আদালতের স্পর্শকাতর এজলাস থেকে মামলার নথি গায়েব ও চেক চুরিতে জড়িয়ে পড়েছেন বেশ কয়েকজন আইনজীবী, পেশকার ও উমেদার। বিচারপ্রার্থীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা এই পেশাজীবীরাই আদালতে রক্ষক থেকে ভক্ষক হয়ে উঠেছেন।

নথি থেকে এক কোটি ৪০ লাখ টাকার চেক চুরির ঘটনায় পেশকার এএম মাসুদ হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও আইনজীবী, সহকারী ক্লার্কসহ তিনজনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। একইভাবে মাদক মামলার নথি গায়েবের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় এক উমেদারের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। আদালতের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কিছুদিন পরপর নথি গায়েব ও চুরির ঘটনায় বারবার উঠে আসছে এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের নামই।

মহানগর দায়রা জজ আদালতের নাজির মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, নথি থেকে দেড় কোটি টাকার চেক চুরির ঘটনায় বেঞ্চ সহকারী এএম মাসুদ হাসানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে। অ্যাডভোকেট ক্লার্ক অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এনামুল হক, জিকু দাশ এবং ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। অফিস সহায়ক তপন কান্তি দের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

চট্টগ্রাম পঞ্চম আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট মো. মহিবুল্লা চৌধুরী বলেন, পেশকার মাসুদই নথি ও চেক চুরিব ঘটনার হোতা। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা না করে ফৌজদারি মামলার আসামি করা উচিত ছিল। তাহলে কেউ এমন ঘটনা ঘটাতে আর সাহস করত না।

কোতোয়ালি থানার ওসি নেজাম উদ্দিন বলেন, উমেদার শুভ দের বিরুদ্ধে নথি চুরির মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়েছে। গত বুধবার করা মামলার তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দু'বার ৯ কোটি টাকার চেক চুরিতে অভিযুক্ত পেশকার মাসুদ :চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) এএম মাসুদ হাসান। তিনি যে আদালতে দায়িত্ব পালন করেন, সেখানেই ঘটে কোনো না কোনো অঘটন, উধাও হয়ে যায় চেক প্রতারণা মামলার চেক! চট্টগ্রাম পঞ্চম যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে সাতে তিন কোটি টাকার তিনটি চেক চুরির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়েছে।

চেক চুরির পরই পঞ্চম যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ মো. জহির উদ্দিনের আদালত মহানগর দায়রা জজ আদালত বরারব ২০১৯ সালের জুলাই মাসে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বিচারক উল্লেখ করেছেন, '২০১৯ সালের ১৯ মে আদালত চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের এপিপি অভিযোগ করেন একটি মামলার নথি পাচ্ছেন না। এ ঘটনার পর ২০ মে আদালতের বেঞ্চ সহকারী এএম মাসুদ হাসান ও অফিস সহায়ক তপন কান্তি দেকে শোকজ করা হয়। একই সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া চেক প্রতারণার দায়রা নম্বর ১৮১১/১৮ মামলা, দায়রা নম্বর ১৮১৪/১৮ এবং দায়রা নম্বর ১৮১৫/১৮ মামলা তিনটির নথি বিচারকের কাছে উপস্থাপনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। যথাযথভাবে অবগত করার পরও মাসুদ ও তপন কারণ দর্শানোর জবাব দাখিল করেননি।'

অন্যদিকে, ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজের কাছে পঞ্চম যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ মো. জহির উদ্দিন ১২টি চেক হারানোর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। সেই তদন্ত প্রতিবেদনে নথি থেকে ৫ কোটি ৬১ লাখ ৮৫ হাজার টাকার ১২টি চেক চুরির ঘটনায় বিভাগীয় তদন্তে পেশকার এএম মাসুদ হাসানকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি প্যাসিফিক ইমপেক্সের মালিক এসএম পারভেজ আলম বাদী হয়ে একটি চেক প্রতারণা মামলা করেন। মামলায় নগরীর পাঁচলাইশ এলাকার বাসিন্দা ফয়সাল আল বকরের বিরুদ্ধে ৫ কোটি ৬১ লাখ ৮৫ হাজার টাকার চেক প্রতারণার অভিযোগ আনেন। এ মামলায় আসামি ফয়সাল দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। ২০১৮ সালের ১০ এপ্রিল ফয়সালকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরদিন ১১ এপ্রিল মামলার সাক্ষ্য দিতে গেলে নথি থেকে ১২টি চেক গায়েব হয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। এরপর পেশকার মাসুদের বিরুদ্ধে আরেকটি বিভাগীয় মামলা হয়।

নথি থেকে চেক চুরি করেন আইনজীবীও: আদালতের নথি থেকে ২৭ কোটি ৯৭ লাখ ৮৮ হাজার ৭২ টাকার চেক চুরির ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় আইনজীবী জোবায়ের মোহাম্মদ আওরঙ্গজেবকে সদস্যপদ ও লিন (আইনজীবী আইডি নম্বর) স্থগিত করে আইনজীবী সমিতি। ২ অক্টোবর আইনজীবী সমিতি শাস্তিমূলক এ পদক্ষেপ নেয়। আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এনামুল হক বলেন, সমিতির কার্যনির্বাহী বৈঠকে জোবায়ের মোহাম্মদ আওরঙ্গজেবকে সমিতির সদস্যপদ ও লিন নম্বর স্থগিত করা হয়েছে। সমিতির সাধারণ সভায় এটি অনুমোদন পেলে তখন তার আইনজীবী সনদ বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে বার কাউন্সিলে চিঠি পাঠিয়ে সুপারিশ করা হবে। এখন তিনি আর আইনজীবী হিসেবে ওকালতনামা দিয়ে কোনো মামলা লড়তে পারবেন না।

৯ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ পঞ্চম আদালতে দায়রা-১৮৩৭/২০১৪ নথি থেকে অ্যাডভোকেট জোবায়ের মোহাম্মদ আওরঙ্গজেব চেক চুরি করেন। ১২ সেপ্টেম্বর বিচারক মো. জহির উদ্দিন মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের কাছে চিঠি দেন। তার পরে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ১৩ সেপ্টেম্বর আইনজীবী সমিতিতে চিঠি পাঠান মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমান। তারপর তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা নেয় সমিতি। যদি আইনজীবী জোবায়ের মোহাম্মদ আওরঙ্গজেব নথি থেকে চেক চুরি করার বিষয়টি স্বীকার করেননি। তিনি এটিকে ভুল বোঝাবুঝির ঘটনা বলে দাবি করেন।

মাদক মামলার নথি গায়েবে উমেদার শুভ: আদালত থেকে মাদক মামলার (দায়রা নম্বর ১০১০৮/২০১৯) নথি গায়েবের ঘটনায় সেরেস্তা শাখার উমেদার সুব্রত দাশ শুভর নাম জড়ায়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় শুভ, মাদক মামলার আসামি তৈয়মুর খান ওরফে তোমহা, মো. ফারুক, আবু আহমদ ও আসলাম খানকে আসামি করে গত ১৭ জানুয়ারি বেঞ্চ সহকারী মনির হোসেন সরকার বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি মামলাটি শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। নথিটি আগের দিন বিকেলে সেরেস্তা থেকে এজলাসে পাঠানো হয়। কিন্তু নথিটি শুনানির দিন ১৩ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টায় পাওয়া যায়নি। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি বিকেল ৫টার পর থেকে ১৩ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে যে কোনো সময় নথিটি চুরি হয়।