ওমান ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশ দলকে বরণ করে নিয়েছে আগেই। আতিথেয়তা স্বরূপ টাইগারদের বিশ্বকাপ কন্ডিশনিং ক্যাম্পের সুযোগ করে দিয়েছে মাসকটে। বরণ পালার পর্ব পেরিয়ে এবার সরাসরি ময়দানি লড়াইয়ে নামার অপেক্ষা। মাসকটের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে জম্পেশ লড়াই উপহার দিতেই এতদিন মরুর তপ্ত বুকে অনুশীলন, গা গরমের ম্যাচ খেলা মাহমুদউল্লাহদের। ১০ দিন ধরে ক্রিকেটের বৃত্তে তারা যা কিছুই করেছেন, তার সব বিশ্বকাপ মঞ্চে প্রদর্শনের জন্য তুলে রেখেছেন। মাসকটের ঘড়ির কাঁটা বলছে, রাত পোহালে শুরু হবে বিশ্বকাপের ডামাডোল। টাইগাররাও শুনতে পাচ্ছেন টি২০ বিশ্বকাপের ঘড়ির পেন্ডুলামের শব্দ। নিউ নরমাল সময়ে যে উন্মাদনা বাড়িয়ে দিচ্ছে ক্রিকেটারদের নাড়ির গতি। এবারের বিশ্বকাপের প্রথম আকর্ষণই তো তারা। মাসকটের আল আমেরাত স্টেডিয়ামে কাল বাংলাদেশের ম্যাচ দিয়েই তো পর্দা উঠবে টি২০ বিশ্বকাপের সপ্তম আসরের।

২০১৪ ও ২০১৬ সালের মতো এবারও বাছাই পর্ব খেলে সুপার টুয়েলভে যেতে হবে বাংলাদেশকে। রাউন্ড অব সিক্সটিন বা বাছাই পর্বে শ্রীলঙ্কার মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলকেও খেলতে হচ্ছে। যদিও বাছাই পর্বে এ দু'দলের কোনো ম্যাচ নেই দুই গ্রুপে থাকায়। বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিতেই টেস্ট খেলুড়ে দেশ দুটিকে দুই গ্রুপের প্রধান করে সূচি সাজিয়েছে আইসিসি। বাংলাদেশ 'বি' গ্রুপ থেকে খেলবে স্কটল্যান্ড, ওমান ও পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে। উদ্বোধনী ম্যাচের প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড। প্রস্তুতি পর্বে যারা ভালো ক্রিকেট খেলে মঞ্চ তাতিয়ে রেখেছে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের প্রস্তুতি পর্ব ভালো হয়নি। আবুধাবিতে শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের কাছে আইসিসির অফিসিয়াল প্রস্তুতি ম্যাচে জুটেছে পরাজয়। বিসিবি ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান আকরাম খানের এ নিয়ে মন খারাপ। তিনি বৃহস্পতিবার রাতেই ঢাকা থেকে মাসকটে উড়ে এসেছেন দলকে উজ্জীবিত করতে। বায়োসিকিউর বাবলে যেতে না পারলেও ভিডিও মিটিংয়ে ক্রিকেটার ও টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনায় থাকবেন সাবেক এ অধিনায়ক। বিশ্বকাপে একটা ভালো শুরুর দেখার আশা নিয়ে বোর্ড কর্মকর্তাদের অনেকেই হয়তো মাসকটে থাকবেন কাল। টাইগারদের সমর্থন দিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও টিকিট কিনে রেখেছেন। সুতরাং গ্যালারির সাপোর্টও থাকবে লাল-সবুজের সঙ্গে। সব মিলিয়ে দেশের ভেন্যুতে খেলার মতো আমেজ থাকবে। যেটা কাজে লাগিয়ে একটা ভালো শুরু উপহার দিতে পারে বাংলাদেশ।

পাঁচ দিনের ক্যাম্পে ওমান 'এ' দলের বিপক্ষে গা গরমের একটি ম্যাচ খেলায় কন্ডিশন সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা হয়ে গেছে লিটনদের। এই জায়গায় স্কটল্যান্ড ও পাপুয়া নিউগিনি কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও স্বাগতিক ওমানের ক্ষেত্রে যেটা ভিন্ন। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মুম্বাই দলের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ তো খেলেছেই, সম্প্রতি দেশের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টি২০ সিরিজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে স্বাগতিকরা। যদিও এই সংস্করণে অভিজ্ঞতা বড় ব্যাপার। টানা ছয়টি টি২০ বিশ্বকাপ খেলে অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করে ফেলেছে বাংলাদেশ। সে অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয় যদিও। ২০০৭ সালের টি২০ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আসর বাদ দিলে গর্ব করার মতো তেমন কোনো পারফরম্যান্স নেই টাইগারদের রেকর্ড বুকে; বরং ২০০৯ ও ২০১৪ টি২০ বিশ্বকাপে আইসিসির দুই সহযোগী দেশ আয়ারল্যান্ড (তৎকালীন) ও হংকংয়ের কাছে হারের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ২০১৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপে বাছাই পর্বে ধর্মশালায় ওমানও দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপহার দিয়েছিল। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি জিতে নিয়েছিল অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে। এই বিশ্বকাপেও অভিজ্ঞতাই শক্তি টাইগারদের। কারণ প্রস্তুতির কথা চিন্তা করা হলে খুব একটা ভালো করেনি বাংলাদেশ। দেশে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে স্লো ও টার্নিং উইকেট বানিয়ে। যে ম্যাচগুলোতে উইকেট ভালো ছিল, মাহমুদউল্লাহরা তাতে জিততে পারেনি। ওই দুটি সিরিজ জিতে আত্মবিশ্বাস নিলেও ব্যাটিং বা বোলিং থেকে পেয়েছে ভুল আত্মবিশ্বাস বা 'ফলস কনফিডেন্স'। আমিরাতের দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ হারে যেটা স্পষ্ট করে দিয়েছে বেশি করে।

প্রস্তুতি পর্বে হারের একটা ভালো দিকও আছে- মূল ম্যাচে জীবন বাজি রেখে খেলার চেষ্টা থাকে। বাংলাদেশ দল সেভাবেই পরিকল্পনা করছে বলে হোয়াটসঅ্যাপ আড্ডায় জানান কোচ রাসেল ডমিঙ্গো। শ্রীলঙ্কা ও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ভুলগুলো কোথায় হয়েছে পোস্টমর্টেম করে দেখা হচ্ছে। ভিডিও অ্যানালিস্ট কোচ শ্রীনিবাস গ্রুপের তিন প্রতিপক্ষকে নিয়ে বিশ্নেষণ তুলে ধরছেন ক্রিকেটারদের সামনে। গতকাল ছুটি থাকায় টিম মিটিংয়ে পরিকল্পনাবিষয়ক কাজগুলো ভালোভাবে করা গেছে। খেলোয়াড়দের শারীরিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা করতেও বিশ্রামটা দরকার ছিল। কয়েকজন ক্রিকেটার ও টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যদের সঙ্গে মেসেজের মাধ্যমে জানা গেছে, টানা পরিশ্রমে ক্লান্তি ভর করেছে দলে। ৩ থেকে ১৪ অক্টোবর তিনবার বিমান ভ্রমণ করতে হয়েছে খেলোয়াড়দের। বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচ শেষ করেই মাসকটে ফিরতে হয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বকাপ শুরুর এক দিন বাকি থাকলেও পুরো দল একসঙ্গে হতে পারেনি। আইপিএল শেষ করে মুস্তাফিজ আবুধাবির ক্যাম্পে দলের সঙ্গে যোগ দিলেও সাকিব যোগ দেওয়ার কথা আজ সকালে। আইপিএল নিয়ে গতকালও ব্যস্ত ছিলেন তিনি। তার দল কলকাতা নাইট রাইডার্স ফাইনাল ম্যাচ খেলেছে বিশ্বকাপ ভেন্যুতেই। ম্যাচের ভেতরে থাকায় ভালো একটা ছন্দ নিয়েই দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারছেন সব্যসাচী এ ক্রিকেটার। তার ও মুস্তাফিজের ভালো খেলার ওপর বাংলাদেশের বিশ্বকাপে ভালো করা অনেকটাই নির্ভরশীল। ফিট মাহমুদউল্লাহকেও পেতে হবে ম্যাচে। অধিনায়ক অবশ্য গতকাল এসএমএস বার্তায় নিশ্চিত করেছেন উদ্বোধনী ম্যাচে খেলতে পারবেন। অধিনায়ক ছাড়া স্কোয়াডের বাকি সবাই সুস্থ এবং ফিট আছেন বলে জানান নির্বাচক হাবিবুল বাশার। বায়োসিকিউর বাবলে এই সময়ে ক্রিকেটারদের ফিট থাকাটাই ভালো খবর। কারণ ফিট থাকলে বিশ্বকাপ জানবাজি রেখে খেলার চেষ্টা থাকবে সবারই।