কারাবন্দি ও জামিনে থাকা এক হাজার ২১৯ জঙ্গির তথ্যভান্ডার গড়ে তুলেছে পুলিশের সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইউনিট (এন্টি টেররিজম ইউনিট-এটিইউ)। জঙ্গিদের বয়সসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্নেষণের ভিত্তিতে করা হয়েছে আলাদা ক্যাটাগরি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এর ফলে বিশেষায়িত এ ইউনিটের কাজে আরও গতি আসবে, সহজ হবে জঙ্গির ওপর নজরদারি।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ইউনিটের কার্যক্রমে গতি বাড়াতে মোবাইল ফোন ট্র্যাকার ও আইপি ট্র্যাকার সুবিধা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেইসঙ্গে বাড়ানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক জঙ্গি তৎপরতা নজরদারির সক্ষমতা। পূর্বাচলে নিজস্ব ভবন গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের আট বিভাগে চালু করা হচ্ছে ইউনিটের নিজস্ব কার্যালয়।

এটিইউর মিডিয়া ও অ্যাওয়ারনেস শাখার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসলাম খান সমকালকে বলেন, অভিযানিক কার্যক্রম শুরুর পর মাত্র দুই বছরে দেড় শতাধিক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে এটিইউ। এর মধ্যে রংপুরে জাপানি নাগরিক হোসিও কোনি হত্যায় জড়িতরাসহ চাঞ্চল্যকর বিভিন্ন মামলার আসামি রয়েছে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে এটিইউর শাখা চালু হলে এই ইউনিটের কাজে আরও সফলতা আসবে।

জঙ্গিবাদ দমনে ২০১৬ সালে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট গঠন করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ইউনিট হিসেবে তাদের কার্যক্রম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। পরে আইজিপির নির্দেশে ঢাকার বাইরেও তারা অভিযান চালায়। একপর্যায়ে জঙ্গি দমনে জাতীয়ভাবে কাজ করতে এন্টি টেররিজম ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এ ইউনিটের অনুমোদন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তারা কাজ শুরু করে। তবে ইউনিটটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে এই ইউনিটের গঠন ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৫৮১টি পদ সৃষ্টি করা হয়। এর মধ্যে একজন অতিরিক্ত আইজিপি, একজন ডিআইজি, দুইজন অতিরিক্ত ডিআইজি, পাঁচজন পুলিশ সুপার, ১০ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ১২ জন সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি), ৭৫ জন পরিদর্শক, ১২৫ জন উপপরিদর্শক এবং বাকি পদগুলো কনস্টেবলের। দেওয়া হয় ৪১টি যানবাহন। জঙ্গি দমনে মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে ছয়টি শাখায় সাজানো হয়েছে এই বিশেষ ইউনিট। এর মধ্যে সোয়াত, ক্রাইমসিন ইনভেস্টিগেশন, বোমা, ক্রাইসিস ইমার্জেন্সি রেসপন্স, বিস্ম্ফোরক নিষ্ফ্ক্রিয়করণ ও কে-নাইন (ডগ স্কোয়াড) অন্যতম। এর সঙ্গে রয়েছে দুটি বিশেষ গবেষণা সেল।

সূত্র জানায়, দেশের আট বিভাগে চালু হচ্ছে ইউনিটের নিজস্ব কার্যালয়। সেখানে একজন পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে চলবে কার্যক্রম। আইনানুগভাবে জাতীয় পর্যায়ের সব ডাটাবেজে (এনআইডি, বিআরটিএ, এনবিআর ও ইমিগ্রেশন) এটিইউর প্রবেশাধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ইউনিটের দায়িত্বশীলরা জানান, জঙ্গিদের দুর্বল করতে তাদের অস্ত্র ও বিস্ম্ফোরকের উৎস বন্ধের জন্য গবেষণা সেল দুটি কাজ করছে। তারা বিভিন্ন স্থানে বিস্ম্ফোরণের ধরন সম্পর্কে অনুসন্ধান করে থাকে। এরপর সেখানে ব্যবহূত রাসায়নিক সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে আমদানিকারকের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ছাড়া ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কেও একটি গবেষণা সেল রয়েছে। এই সেলের সদস্যরা তদন্তের মাধ্যমে কোন মতাদর্শের জঙ্গিরা কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে সে ব্যাপারে একটি তথ্যভান্ডার গড়ে তুলেছেন। তাতে দেখা যায়, সীমান্তের দুটি পথে এখন অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা চালায় জঙ্গিরা। এর মধ্যে একটি পাহাড়ি ও অন্যটি নদীপথ। নদীপথ হিসাবে তারা ব্যবহার করে উত্তরাঞ্চলের একটি জেলার সীমান্ত। অপর পথটি পার্বত্যাঞ্চলের এক জেলায়। এরপর ফেনী ও আরেকটি জেলা থেকে হাতবদল হয়ে জঙ্গিদের কাছে বিভিন্ন সময়ে পৌঁছায় অস্ত্র। ওইসব এলাকায় এরই মধ্যে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এটিইউর অপারেশন শাখার পুলিশ সুপার ছানোয়ার হোসেন জানান, পুরান ঢাকার বিভিন্ন রাসায়নিকের দোকান থেকে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিস্ম্ফোরক সংগ্রহ করত জঙ্গিরা। তদন্তে বিষয়টি বেরিয়ে আসার পর ব্যবসায়ী সমিতির নেতাদের ডেকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলা হয়। এ কারণে কৌশল বদলে এখন ম্যাচের কাঠির বারুদ জমিয়ে তা বোমার উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করছে জঙ্গিরা। সম্প্রতি বিভিন্ন পুলিশ বক্সে বোমা হামলার ঘটনায় এ ধরনের বারুদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলে বিভিন্ন ম্যাচ ফ্যাক্টরির দায়িত্বশীলদের বলা হয়েছে, তারা যেন ম্যাচের কাঠিতে কম বারুদ ব্যবহার করেন।

জানা যায়, বোমাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গবেষণা সেলে পাঠানো হয়। তাদের কাছ থেকে বোমা বানানোয় পারদর্শীদের সম্পর্কে একটি ধারণা নিয়ে ওই জঙ্গিদের 'মোস্ট ওয়ান্টেড' হিসেবে চিহ্নিত করে বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়। তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে জঙ্গিদের বোমা সরবরাহ অনেকটাই বন্ধ হবে।