সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাস হয়নি। নগরীর চৌহাট্টায় অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে দাপ্তরিক কার্যক্রম। তবে পাঠদান কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। স্থায়ী ক্যাম্পাসের উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ বাকি রয়েছে। এরই মধ্যে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এদের একটি বড় অংশেরই বসার জায়গা নেই। অভিযোগ উঠেছে, অধিকাংশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আর্থিক সুবিধা নিয়ে। প্রথম দফায় অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, এরপর নিয়ম লঙ্ঘন করে কয়েক দফা মেয়াদও বৃদ্ধি করা হয়। এখন আবার টাকার বিনিময়ে তাদের কাউকে কাউকে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

সম্প্রতি ১৯টি পদে স্থায়ী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে কয়েকজন 'পছন্দের প্রার্থীকে' এসব পদে নিয়োগ দিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. মঈনুল হক চৌধুরী নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।

পাঁচজন চাকরিপ্রার্থী দাবি করেন, কাঙ্ক্ষিত অর্থ দিতে না পারায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি। অথচ বিধি অনুযায়ী বয়স বা শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সব মিলে ১৭৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে সিংহভাগ অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত তিনজন জানিয়েছেন, অধিকাংশ কর্মকর্তার বসার জন্য জায়গা বা টেবিল নেই। এ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকলেও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নানাভাবে ম্যানেজ করে চলছেন উপাচার্য।

২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হয়ে আসেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবি) সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ) মঈনুল হক। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে শাবিতে বিএনপি-জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা পরিষদের প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন মঈনুল হক।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, উপাচার্য ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের কয়েকজন আত্মীয়স্বজনকে অস্থায়ী নিয়োগ দিয়েছেন। এদের মধ্যে শিবিরের সাবেক বেশ কয়েকজন ক্যাডারও নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া প্রভাবশালী কয়েকজন রাজনীতিবিদের আত্মীয়স্বজনও চাকরি পেয়েছেন।

তিন কর্মকর্তার দাবি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলার পলাতক আসামি বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরীর আত্মীয় সাবেক শিবির নেতাকে উচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে সহকারী পরিচালক, সেকশন অফিসার, উপসহকারী প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কম্পিউটার অপারেটরসহ জামায়াত-শিবিরের অনেক নেতাকর্মী টাকার বিনিময়ে নিয়োগ পেয়েছেন। এদের মধ্যে অনেকের বয়স ত্রিশের বেশি হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। এমনকি স্নাতকোত্তর পাস না করেও অনেকে কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তৃতীয় বিভাগে এইচএসসি পাস করেও একজন সেকশন অফিসার হয়েছেন।

গত শুক্রবার সিলেট নগরীর বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতালে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সেকশন অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। এতে 'পছন্দের প্রার্থীদের' আগেভাগে প্রশ্নপত্র দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এদের মধ্যে সেকশন অফিসার পদে আটজন প্রশ্নপত্র পেয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে অন্তত ৯ জন স্থায়ী নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পেয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে উপাচার্যের ১৩ জন আত্মীয় নিয়োগ পেয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের আত্মীয়স্বজনও নিয়োগ পেয়েছেন। সিলেটে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকার সময় মাত্র দু'জন কর্মকর্তা সবকিছু দেখাশোনা করতেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, কোনো ধরনের পাঠদান বা দাপ্তরিক কার্যক্রমের চাহিদা ছাড়া বিপুলসংখ্যক নিয়োগদান অপ্রয়োজনীয়। নিয়মনীতি অনুসরণ করলে বৈধপন্থায় এভাবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই।

সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে দেওয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। গত ১০ জানুয়ারি ছয়জন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার চাহিদার কথা উল্লেখ করা হয়নি। চলতি বছরে দেওয়া আরও তিনটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয় পরিস্কার উল্লেখ ছিল না। গত ৫ জুলাই প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে একজন করে সহকারী রেজিস্ট্রার ও সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে সর্বনিম্ন বয়স ৩৭ বছর উল্লেখ করা হয়। পছন্দের প্রার্থীদের সুবিধা দিতে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই বিজ্ঞপ্তিতে একজন করে হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও উপসহকারী প্রকৌশলী পদের জন্য বয়সসীমা অনূর্ধ্ব ৩০ বছর ছিল। গত ২৬ জুলাই উপপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) পদের সর্বনিম্ন বয়স ৪২ বছর উল্লেখ করা হয়।

সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য দক্ষিণ সুরমায় প্রায় ১০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বর্তমানে নগরীর চৌহাট্টায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ে অস্থায়ীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চলছে। ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের বাসভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আজ রোববার প্রথমবারের মতো এমবিবিএস পরীক্ষা শুরু হচ্ছে।

উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী নিয়োগ বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। এসব ব্যাপারে তিনি জড়িত নন এবং জানেন না বলে দাবি করেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অস্থায়ী নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অধিকাংশ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

গত শুক্রবার ২২ জন কর্মকর্তার নিয়োগ পরীক্ষার কথা নিশ্চিত করেছেন উপাচার্য। তবে তাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ জানেন না বলে দাবি করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয় উল্লেখ না থাকলেও আবেদন ফরমে থাকে বলে দাবি করেন তিনি।

ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের শিবির-সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করে পায়নি বলে দাবি করেন উপাচার্য ডা. মোর্শেদ আহমদ। তবে মঈনুল হক শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি-জামায়াতপন্থি কর্মকর্তা পরিষদের প্যানেলে নির্বাচন করেছেন- এমন তথ্য পরে জেনেছেন বলে দাবি করেন ডা. মোর্শেদ। আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় স্থায়ী নিয়োগের এজেন্ডা সম্পর্কে তিনি বলেন, এখনও মৌখিক পরীক্ষা বাকি রয়েছে। এরপর স্থায়ী নিয়োগের বিষয় আসবে।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে কথা বলতে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. মঈনুল হক চৌধুরীর সঙ্গে নানাভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। রিং হলেও কেউ তা রিসিভ করেননি বা পরে কলব্যাক করেননি।