পীরগঞ্জের জেলেপল্লি হিসেবে পরিচিত মাঝিপাড়ায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বসতঘর মেরামতের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। হামলার কয়েকদিন পার হলেও ধ্বংসচিহ্নগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে এখনও। অসহায় পরিবারগুলোকে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে এরই মধ্যে পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। গতকাল শনিবার তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশন। গতকাল দুপুরে স্থানীয় বটতলা দাখিল মাদ্রাসা মাঠে 'ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার' স্লোগানে ক্ষতিগ্রস্ত ৮০ পরিবারের মাঝে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়।

খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল ৩০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ১ কেজি পেঁয়াজ, ১ কেজি রসুন, ৫০০ গ্রাম আদা, ৫০০ গ্রাম শুকনা মরিচ, ২ কেজি সয়াবিন তেল, ১ কেজি বুটের ডাল, ২ কেজি আটা, ১ কেজি চিনি, ১ কেজি লবণ, ২০০ গ্রাম হলুদ, ২৫০ গ্রাম সরিষার তেলসহ শাড়ি ও লুঙ্গি।

খাদ্য ও বস্ত্র সহায়তা পেয়ে মাঝিপাড়ার বাসিন্দা সহিবা রানী বলেন, 'সরকার হামাক নয়া ঘর করি দেছে। এক মাসের খাবার পানু, এ্যালা ম্যালা সুবিধা হইল। মাসের খাবার নিয়া আর টেনশনোত থাকার লাগবার নয়। সমকাল থ্যাকি যে খাবার দেছে, কাপড় দেছে, তাতে করি ম্যালা সুবিধা হইল। অ্যালা চাওয়া পাওয়ার কিছু নাই, হামরা অ্যালা এই দ্যাশোত শান্তিতে থাকবার চাই।' একই এলাকার শরৎ চন্দ্র বলেন, 'হামার বাড়ি পুড়ি যাওয়ার পর প্রশাসন হামাক বাড়ি বানেয়া দিছে। রান্দা খাবার পাছনু। অ্যালা চাইল, ডাইল, ত্যাল-মসল্লা, নুন আরও কতকি দিছে। অ্যালা হামার খাবারের চিন্তা নাই। রান্দাবাড়া করি খামো। নতুন করে কামোত যামো। বাঁচবার নাগবে। প্রশাসন হামার খেয়াল থোসে, নিরাপত্তা দেছে। যদিও মন থ্যাকি অ্যালাও টেনশন কমে নাই। থাকি থাকি ভয় নাগে। আবার কখন বা কোন দিক থ্যাকি হামার উপর হামলা হয়।'

সুনীতি দাস নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, সমকালের উদ্যোগে চাল-ডাল, তেল, লবণ, কাপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা পেয়েছি। পুড়ে যাওয়া ঘর নতুন করে নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু মনের ভেতরে যে পোড়া ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা কী করে সারাবো। এখনও অনেকটা আতংকের মাঝে রাত অতিবাহিত করছি। আমরা পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছি। এখন সহায়তা চাই শান্তিতে থাকার। প্রশাসন যেন আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, আর যেন কখনও কোনো সংখ্যালঘুর বাড়িতে হামলা না হয়, লুটপাট না হয়, অগ্নিসংযোগ না হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন, রংপুর জেলা প্রশাসক আসিব আহসান, পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার, সমকালের সহকারী সম্পাদক ও সমকাল সুহৃদ সমাবেশের প্রধান সিরাজুল ইসলাম আবেদ, আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর তারেক মাহমুদ সজীব, রংপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুব রহমান, পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিরোদা রানী, পীরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র তাজিমুল ইসলাম শামীম, পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোকসেদ আলী সরকার, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আব্দুল্লাহেল বাকী বাবলু, শাহ মো. সাদা মিয়া, হাসান আলী প্রধান, সুহৃদ উপজেলা সদস্য রুবিনা খাতুন, রিপন মণ্ডল, মোস্তারি ইয়াসমিন অরিন, মোরসালিন, শাহানুর আলম, রুবেল, মিঠু, আখতারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান বলেন, সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে এই সহায়তা দেওয়া প্রশংসনীয়। সরকারও ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা এবং সহায়তা দুটিই নিশ্চিত করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘু পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার জন্য সমকাল সুহৃদ সমাবেশ ও আল-খায়ের ফাউন্ডেশনকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা অসহায় মানুষদের দূর্দশার চিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি এ ধরনের মানবিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি সংগঠন অসচ্ছল-ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালে দেশ দ্রুতই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ হয়ে উঠবে।

পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, শুধু সংবাদ নিয়েই সমকাল কাজ করে না। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সমকাল সুহৃদের যে ভূমিকা, তা প্রশংসনীয়। তাদের এ কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানাই। পুলিশের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা তৎপর রয়েছি। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ত্রুটি নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।