সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের বড় মোহাম্মদপুর গ্রাম। ছোট্ট একটি পাকা সড়ক গ্রামটিকে দু'ভাগ করে রেখেছে। গ্রামের ভেতর যেমন আছে সবুজের সমারোহ, তেমনি হাওরে আছে ফসল আর মাছ। ছায়াঘেরা এই গ্রাম তুচ্ছ ঘটনায় অশান্ত হয়ে উঠছে বারবার, ঝরছে রক্ত। কয়েক শতক জমি নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে এক বছরেই ডজন খানেক হামলা-মামলার ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ হলেই উভয় পক্ষ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমে পড়ে। শুধু মোহাম্মদপুর গ্রাম নয়, প্রবাসী অধ্যুষিত এই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সংঘর্ষ হলেই অস্ত্রের ব্যবহার হয় নির্বিঘ্নে। তবে অধিকাংশ ঘটনায় অস্ত্র উদ্ধার হয় না, অস্ত্রধারীরাও থেকে যায় অধরা। অভিযোগ আছে, যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের অর্থায়ন ও প্রশ্রয়ে অনেক সময় তুচ্ছ ঘটনায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন দেশে অবস্থানরত তাদের স্বজন। সহিংসতার ঘটনায় হওয়া মামলার পেছনে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ও করছে উভয় পক্ষ।

উপজেলায় গত এক বছরে হামলা-সংঘর্ষে মারা গেছেন আটজন। আহত হয়েছেন শতাধিক। সর্বশেষ ১২ অক্টোবর আশারকান্দি ইউনিয়নের শান্তির বাজারে চুল কাটা নিয়ে অস্থিরতা শুরু হয়। পরে মজলিশপুর ও ঐয়ারকোনা গ্রামের লোকদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন পাঁচজন।

বছর খানেক আগে মোহাম্মদপুর গ্রামে সংঘর্ষকালে প্রকাশ্যে গুলি করতে দেখা যায় নাইম নামে এক যুবককে। এমনকি তার মা আগ্নেয়াস্ত্র বহন করছিলেন। ওই গ্রামে অতিথি হিসেবে গিয়েও হামলার শিকার হওয়ার নজির রয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানার পর তা সমাধানে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতিকে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে একপক্ষ না মানায় সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়। উপজেলায় ঘন ঘন সংঘর্ষ ও অস্ত্রের ব্যবহারের পেছনে প্রবাসী অর্থায়নের বিষয়টি স্বীকার করে এম এ মান্নান সমকালকে বলেন, তাদের অনেক টাকা হয়েছে। দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি অনেকে বৈধ অস্ত্র লুকিয়ে ব্যবহার করে। এটা চিন্তার বিষয়। তবে আমরা শঙ্কিত নই। আগের চেয়ে এখন হামলা-মামলা কমে আসছে। পুলিশ প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।

৯ অক্টোবর মোহাম্মদপুর গ্রামে গেলেও অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। তাদের বক্তব্য কারও বিপক্ষে চলে গেলে সমস্যা হতে পারে- এমন ভয় থেকেই তারা মুখ খুলতে নারাজ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামের এক তরুণ বলেন, গ্রামের মানুষ আতঙ্কে আছে। দু'পক্ষের মধ্যে বারবার সংঘর্ষের কারণে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নতুন করে আবার সংঘর্ষ হতে পারে। একটি পক্ষ প্রায়ই মহড়া দেয়। তারা আগেও সংঘর্ষের সময় গুলি করেছে। এই তরুণ জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ছইল মিয়া ও তার পক্ষের সাহেল আহমদ এবং আব্দুল কুদ্দুছের সঙ্গে একই গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য হবিবুর রহমান হবি, রুনু মিয়া ও সানা মিয়াদের বিরোধ চলছে। রাস্তার পাশের ২-৩ শতক জমি নিয়ে এ বিরোধ।

গ্রাম পরিদর্শনকালে উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা হয়। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। এক পক্ষের ছইল মিয়া সমকালকে বলেছেন, যে জমি নিয়ে বিরোধ ১৯৫৬ সালের রেকর্ড অনুযায়ী তারা সেটির মালিক। প্রতিপক্ষ জমি দখল করতে চাচ্ছে। এক বছরে ছয়-সাতবার তারা হামলা ও গুলি করেছে। তবে কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। কিছু লোক ইন্ধন দিচ্ছে। উপজেলার মুরুব্বিরা আপসের উদ্যোগ নিলেও প্রতিপক্ষ মানেনি। প্রতিপক্ষের হবিবুর রহমান হবি ডাকাতিসহ একাধিক মামলার আসামি দাবি করে তিনি বলেন, হবি প্রবাসী আত্মীয়দের টাকা পেয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিরোধী পক্ষের বাচ্চু মিয়া বলেছেন, নাইমের বাড়ির সামনের ওই জমিটি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত। সেজন্য তারা ভোগদখল করছেন। জোর করে প্রতিপক্ষ জমি দখল করতে চাচ্ছে। এক কলেজছাত্রকেও তারা মেরে ফেলেছে।

উভয় পক্ষের বিরোধের কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমে আবাদ করা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আকমল হোসেন সমকালকে বলেন, সংঘর্ষ হলেই অস্ত্রের ব্যবহার হওয়াটা দুঃখজনক। কিছু লোকের ইন্ধনের কারণে এসব হয়। আমরা মাঝেমধ্যে সমাধানের চেষ্টা করি।

মামলার কাগজ বিশ্নেষণ করে দেখা যায়, জমি-সংক্রান্ত বিরোধে এক বছরে হত্যার অভিযোগ ছাড়াও, গুলি বর্ষণ, হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে ডজন খানেক মামলা হয়েছে। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর ফয়জুল ইসলাম তার ছেলে মাজহারুল ইসলাম ইমরানকে হত্যার অভিযোগে একটি মামলা করেন। গত ২৭ মার্চ অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। প্রতিপক্ষ দাবি করেছে, মারামারির ঘটনার ১১ দিন পর স্বাভাবিক অবস্থায় ওই মৃত্যু হয়। মামলাটি পিবিআই আবার তদন্ত করছে। অপর পক্ষের সাহেল আহমদ গত বছরের ২৮ এপ্রিল গুলি বর্ষণ ও হামলার অভিযোগে মামলা করেন। ওই ঘটনায় শফিক মিয়ার ছেলে নাইমকে কাটা বন্দুক দিয়ে গুলি করতে দেখা যায়। এমনকি তার মায়ের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। গত এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও অস্ত্র দুটি উদ্ধার হয়নি। নাইমকে প্রকাশ্যে ঘুরতেও দেখা গেছে। যদিও থানার ওসি ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী জানিয়েছেন, অস্ত্রধারীরা গা-ঢাকা দিয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন ঘটনায় একাধিক অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গত ২৪ আগস্ট সাহেল আহমদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে হামলার শিকার হন ছাতকের আনুজানি গ্রামের আত্মীয় রাসেল আহমদ ও জিয়াপুরের সুহেল মিয়া। রাস্তায় পেয়ে প্রতিপক্ষ তাদের ওপর হামলা করে। এ ঘটনায় মামলা করেন রাসেল। অপর পক্ষের ছানা মিয়া গত ৩ আগস্ট হামলার অভিযোগে আরেকটি মামলা করেন। এ ছাড়া অস্ত্রের অংশ বিশেষ উদ্ধারের ঘটনায় একটি অস্ত্র মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলা করেছে উভয় পক্ষ। শুধু বড় মোহাম্মদপুর গ্রাম নয়, গত এক বছরে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ডজন খানেক সংঘর্ষ ও গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রও ব্যবহার করা হয়। উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে উপজেলার কচুরকান্দি গ্রামের ফয়জুল ইসলাম ও পার্শ্ববর্তী পূর্ব বসন্তপুর গ্রামের খালিছ মিয়ার মধ্যে সরকারি জমি নিয়ে সংঘর্ষ। এতে আহত উজ্জ্বল চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি গত ১৯ মে মারা যান। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর কলকলিয়া ইউনিয়নের নাদামপুর গ্রামের যুক্তরাজ্য প্রবাসী সিরাজ মিয়ার সঙ্গে একই গ্রামের বাসিন্দা নজির হোসেনের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ হয়। এতে আটজন গুলিবিদ্ধ হন। গত ১৭ মে উপজেলার রমাপতিপুর গ্রামে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করেন কাজল মিয়া ও তার স্বজন। এতে গুলিবিদ্ধসহ ১৫ জন আহত হন। গত ১৬ এপ্রিল পৌর শহরের ভবানীপুরে বাড়ির রাস্তা নিয়ে সংঘর্ষে মাসুম আহমদ নামে এক যুবক মারা যান। গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর শ্রীধরপাশা গ্রামে মাদ্রাসার নামকরণ নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষে গুলি বর্ষণ করা হয়। এতে নিহত হন নুর আলী নামে এক ব্যক্তি। এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর রানীগঞ্জ ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে দু'পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে মারা যায় মাদ্রাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র সাব্বির। সম্প্রতি উপজেলার কচুরকান্দি গ্রামে কুপিয়ে হত্যা করা হয় উজ্জ্বল নামে এক ব্যক্তিকে।

বারবার সংঘর্ষ ও গুলি বর্ষণের ঘটনা প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করেছি। প্রবাসী এলাকা হওয়ায় তুচ্ছ ঘটনায় মারামারি ও অস্ত্রের ব্যবহার হয়। আমরা এসব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছি।